জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের উন্নয়নে গঠিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছে। রাজধানীর শাহবাগে ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ওপর ফাউন্ডেশনের কার্যালয়। যা ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফাউন্ডেশনে ৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে এ ফাউন্ডেশনে ১০০ কোটি টাকা অনুদান দেন। তখন জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারকে দেখাশোনার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে। সেই কাজ এই ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হবে। আহত যোদ্ধাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করবে ফাউন্ডেশন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের অর্থ প্রদান এখনো সম্পন্ন হয়নি। অপরদিকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ, বহুতল ফাউন্ডেশন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রত্যেক শহীদ পরিবার ৩০ লাখ টাকা এককালীন অনুদান ও ২০ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পাওয়ার কথা। একই সঙ্গে ১৪০০ ফ্ল্যাট, ৭ কাঠা জায়গায় ফাউন্ডেশনের নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণ ও আহতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাসহ ফাউন্ডেশনের তহবিলে ২৩৭ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তবে প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
জুলাই ফাউন্ডেশনের কোনো বাজেট কোড নেই।
এমনকি ফাউন্ডেশনের বেতনভুক্ত কর্মীদের বেতন দেওয়ার কোনো কোডও নেই। শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক দেয় ৫ কোটি এবং নাম প্রকাশ না করা এক নারী দিয়েছিলেন ৫ কোটি টাকা। তাছাড়া সরকারের তরফ থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদানের পর ২৩৪ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে। তবে তা এখনো দেওয়া হয়নি।
শহীদ পরিবারের এক সদস্য জানান, ফাউন্ডেশন গঠনের পর দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, এনজিও সংস্থাও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে তা কাঙ্ক্ষিতভাবে আসেনি। শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের এককালীন অর্থ প্রদান ও মাসিক ভাতা এখনো পুরোপরি প্রদান করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে পরবর্তীতে সরকার ফাউন্ডেশনে বরাদ্দ দেবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কর্নেল (অব.) কামাল আকবর যুগান্তরকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি নতুন বাংলাদেশ। এখন ফাউন্ডেশনের অবস্থাই নড়বড়ে। এ মুহূর্তে ফাউন্ডেশনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। জুলাইয়ে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধের মূল্য আমরা কিছু কিছু পরিশোধ করে দিচ্ছি। আমাদের অফিস স্টাফরা পর্যন্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
কামাল আকবর আরও বলেন, প্রতিশ্রুতি ছিল বেশ বড়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশ্রুতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। প্রত্যেক শহীদ পরিবার ৩০ লাখ টাকা করে পাওয়ার কথা, পেয়েছেন ১০ লাখ টাকা করে। প্রায় ১৫ হাজার আহত যোদ্ধাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরো অনুদান পরিশোধ করা এখনো সম্ভব হয়নি। জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটির চেয়ারম্যান মো. গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে নতুন দেশ, তাদের উন্নয়নে গড়া ফাউন্ডেশনের অবস্থা এমন কি করে হয়? শহীদ পরিবারগুলোকে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত বীরদের রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওদের বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্তভাবে পূরণ করতে পারেনি। গত বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা, এখনো পূর্ণাঙ্গ টাকা দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ পেয়েছেন, কেউ পাননি। নতুন সরকার এলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন শহীদুল ইসলাম।
ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত ৮২৩ শহীদ পরিবার ও আহত ৬ হাজার ৮৩১ জুলাই যোদ্ধাকে আর্থিক ও পুনর্বাসন সহায়তা হিসাবে ১১৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে শহীদ পরিবারের সদস্যসহ ৮ হাজার ৬৪৮ জন জুলাই যোদ্ধা রয়েছেন অপেক্ষমাণ তালিকায়।
জানা যায়, সারা দেশে ৮৬৪টি স্থানে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার কথা রয়েছে। ২১ জন শহীদের নামে গত বছরের ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ এলাকায় নির্মিত দেশের প্রথম ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৫ জন উপদেষ্টা। বাকি স্মৃতিস্তম্ভগুলো কবে নাগাদ নির্মাণ বাস্তবায়ন হবে তাও অজানা। এছাড়া গত বছরের ৮ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অফিস ভাঙচুর করেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের কয়েকজন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। তিনি শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন উন্নয়ন নিয়ে সরকার কাজ করছে। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকেও কাজ চলছে। মন্ত্রণালয় থেকে তাদের উন্নয়নে সরাসরি কাজ হচ্ছে। শহীদ পরিবার ও আহতদের এককালীন অর্থ এবং মাসিক ভাতা প্রদানের কাজ চলমান রয়েছে। ৮৩৬ জন শহীদ পরিবারের মধ্যে ৬৩৪ পরিবারকে সহায়তা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাকিদের সহায়তা প্রদান চলমান আছে। ১৩ হাজার ৮০০ আহত জুলাই যোদ্ধাকে অর্থ ও ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। আরও অনেক আহত জুলাই যোদ্ধা রয়েছেন, আমরা ওদের নিয়েও কাজ করছি।