Image description

দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন। নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’-এর ভিপি পদপ্রার্থী দেলোয়ার হোসেন শিশির ব্যক্তি বা দল নয় শিক্ষার্থীদের অধিকারকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি শাবির ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সিলেটের প্রথম আহত। এরপর ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম ও সংস্কারকাজে যুক্ত রয়েছেন।

নয়া দিগন্ত : আপনাকে ও আপনার প্যানেলকে কেন ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা?

দেলোয়ার হোসেন শিশির : ধন্যবাদ। আমরা যখন প্যানেল গঠন করেছি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রায় ২৩টি পদের জন্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। যাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা আছে, নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা আছে এবং যারা টিম হিসেবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এমন ব্যক্তিদেরই আমরা সম্পাদকীয় পদগুলোতে রেখেছি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের ক্রীড়া সম্পাদক মাহবুব হাসান অনু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। আবার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক শাহিন ভাই জুলাই আন্দোলনের পর শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর পাশে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। এভাবে প্রতিটি সম্পাদকীয় পদে থাকা ব্যক্তিরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও দক্ষ।

প্যানেলের শীর্ষ নেতৃত্ব ভিপি, জিএস ও এজিএস সবাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞ ও সমন্বিত নেতৃত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হলে ইনশা আল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারব। দীর্ঘ দিন শাকসু না থাকায় পূর্ববর্তী কোনো উদাহরণ নেই। আমরা চাই একটি দায়িত্বশীল, কার্যকর ও টেকসই ছাত্র সংসদের উদাহরণ তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। এই লক্ষ্যেই আমরা শিক্ষার্থীদের সমর্থন প্রত্যাশা করি।

নয়া দিগন্ত : আপনার দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের প্রধান সমস্যা কী কী?

দেলোয়ার হোসেন শিশির : আমার দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আবাসন সঙ্কট। এর পাশাপাশি খাবারের মান ও মূল্য নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু বিশেষ করে আমাদের বোনেরা বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাইরের এলাকায় শিক্ষার্থীরা আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যায় পড়ছেন।

অ্যাকাডেমিক দিক থেকে দেখলে গবেষণা বাজেটের ঘাটতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই ও জার্নাল অ্যাকসেস নেই। পুরো ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট-ব্যবস্থা দুর্বল, অনেকসময় স্বাভাবিক কাজও করা যায় না। ইনোভেশন ও গবেষণায় একসময় সাস্ট যে অবস্থানে ছিল, বর্তমানে সেখানে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে।

এ ছাড়া পরিবহন সঙ্কট, বাস ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশগত অবহেলার বিষয়গুলো দীর্ঘ দিন ধরে অব্যবস্থাপনার শিকার। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা এসব সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা নিয়মিত শুনছি এবং এগুলো সমাধানের দিকেই আমাদের মনোযোগ।

নয়া দিগন্ত : এসব সমস্যা সমাধানে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

দেলোয়ার হোসেন শিশির : প্রতিটি সমস্যার জন্য আমরা সুস্পষ্ট এক, দুই ও তিন ধাপের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বিশেষভাবে খাবার সংক্রান্ত বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। শাকসুর দায়িত্ব পেলে প্রথম ধাপে পুরো ক্যাম্পাসে একটি পুষ্টি-সংক্রান্ত সার্ভে পরিচালনা করা হবে।

এই সার্ভের মাধ্যমে ১৮ থেকে ২৪/২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত চাহিদা, খাদ্যাভ্যাস ও রুচি নির্ধারণ করা হবে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পেশাদার নিউট্রিশনিস্টদের সহায়তায় স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত খাবারের মেনু তৈরি করা হবে। এই খাবারগুলো ক্যাম্পাসের ফুড জোন ও ফুড পয়েন্টগুলোতে সরবরাহ করা হবে এবং প্রতিটি পয়েন্টে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের খাবার থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী পছন্দ করতে পারেন। আমাদের মূল স্লোগান হবে ‘দামে কম, মানে ভালো।’ এভাবেই আমরা প্রতিটি সমস্যার জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করেছি, যা ইশতেহার, সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

দেলোয়ার হোসেন শিশির : প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুদের কাছে আমার একটাই অনুরোধÑ আপনারা সবাই ভোট দিতে আসুন এবং শাকসু নির্বাচনকে উৎসবমুখর করে তুলুন। শাকসু আন্দোলনের একজন সৈনিক হিসেবে এবং আপনাদের একজন সহযোদ্ধা হিসেবে আমি চাই সবাই মিলে আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরি এবং সমাধানের পথে এগিয়ে যাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য ভোট চাই না; বরং আমি আহ্বান জানাই যারা সবচেয়ে যোগ্য, আসুন আমরা সবাই মিলে তাদেরকেই ভোট দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করি। যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে হবে

শাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের এজিএস প্রার্থী জহিরুল ইসলাম জহির। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সিলেট বিভাগের সহ-সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন এবং বর্তমানে তিনি বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নয়া দিগন্ত : আপনাকে ও আপনার প্যানেলকে কেন ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা?

জহিরুল ইসলাম জহির : আমাদের প্যানেলটি শুধু ছাত্রদলকে কেন্দ্র করে গঠিত নয়, এটি ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল হলেও এখানে ছাত্রদলের তরুণ নেতৃত্বের পাশাপাশি এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা বিগত সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে ও সমস্যা নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন এবং ক্যাম্পাসে সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের প্যানেলকে গ্রহণ করবে- এর প্রধান কারণ হলো, আমাদের অধিকাংশ প্রার্থী ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় ও জুলাই আন্দোলনে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছেন। শাকসু থাকুক বা না থাকুক, আমাদের কার্যক্রম কখনো থেমে থাকেনি। শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যা বা সঙ্কটে আমাদের প্রার্থীরা ক্যাম্পাস, সিলেট কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়েই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে সেগুলোর সমাধান আদায় করাই শাকসুর মূল দায়িত্ব। আমরা অতীতেও সেই দায়িত্ব পালন করেছি এবং এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর শাকসু একটি গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফিরছে, এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের ওপর আস্থা রাখেন, তাহলে আমরা তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে চাই।

নয়া দিগন্ত : আপনার দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

জহিরুল ইসলাম জহির : সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে আমরা যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি, তার মধ্যে নিরাপত্তা অন্যতম। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তান পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে নিরাপত্তা নিয়ে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকেই আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি। সিলেট শহরে সিএনজি চালকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার ভূমিকা রেখেছি। এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসক ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে এবং তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব। সম্প্রতি পিএমই বিভাগের শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকার ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, শিক্ষক নিয়োগসহ প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শাকসুতে দায়িত্ব পেলে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় অবস্থান নেবো।

পরিবহন সঙ্কটও একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। আমরা ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি এবং বাস সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর দাবিতে আমাদের কার্যক্রম চলমান থাকবে। আবাসন সঙ্কট নিয়েও আমরা বাস্তবভিত্তিক হিসাব করেছি। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী প্রায় সাড়ে ৯ হাজার। নতুন দু’টি হল চালু হলে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বাকি প্রায় আড়াই হাজার অনাবাসিক শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক দুই বা তিন হাজার টাকা ভাতা দেয়া হলে বছরে পাঁচ বা ছয় কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউজিসির জন্য বড় কোনো অঙ্ক নয়। এ ছাড়া মেডিক্যাল সেন্টারের সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। পর্যাপ্ত আসন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে চলমান নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের দ্বারা কিছু নারী শিক্ষার্থী হেনস্থার শিকার হওয়ার অভিযোগও আমরা পেয়েছি। বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও এখনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একই সাথে সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থাও নিয়মিত কার্যকর নয়।

নয়া দিগন্ত : এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

জহিরুল ইসলাম জহির : এসব সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়। শাকসু প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ম্যান্ডেট থাকবে, যা ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকার ও সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা ও দরকষাকষি করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত আবাসন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা খাতের বাজেট যথাযথভাবে নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। অতীতেও আমরা দাবি আদায় করেছি এবং ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

এ ছাড়া নিরাপত্তা জোরদারে আমরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব দিচ্ছি-সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়মিত মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল টিম কার্যকর করা, অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের জন্য কার্যকর মেডিয়েশন ব্যবস্থা চালু। এ ছাড়া মেডিক্যাল সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিয়মিত ভিজিট, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার ঘাটতি দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। ধাপে ধাপে একটি আধুনিক মেডিক্যাল সেন্টার গড়ে তোলার লক্ষ্য আমাদের রয়েছে।

নয়া দিগন্ত : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

জহিরুল ইসলাম জহির : দীর্ঘ ২৮ বছর পর আমরা একটি নতুন ইতিহাসের মুখোমুখি। এই ইতিহাসে যেন কেউ বঞ্চিত না হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি চাই, আপনারা সবাই অন্তত ভোট দিতে আসুন এবং নিজের অধিকার প্রয়োগ করুন। গত সময়ে ক্যাম্পাসে কারা কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে, কারা শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল সেটা বিবেচনা করেই আপনারা ভোট দেবেন। যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়া যেমন আপনার অধিকার, তেমনি দায়িত্বও।

শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস গড়াই আমাদের লক্ষ্য

শাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্রদের প্যানেল ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ এর ভিপি প্রার্থী মহুয়ী শারদ। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রীড়া বিষয়ক সংগঠন ’স্পোর্টস সাস্ট’ এর পাবলিক রিলেশন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নয়া দিগন্ত : আপনাকে ও আপনার প্যানেলকে কেন ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা?

মহুয়ী শারদ : এই প্রশ্নের উত্তর আসলে আমাদের প্যানেলের নামেই নিহিত। আমাদের প্যানেলের নাম ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’। আমরা মূলত সেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই, যারা কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত নন। আমাদের স্বপ্ন একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক ক্যাম্পাস। যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয় ও চাপমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে, কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক আগ্রাসন থাকবে না এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নয়া দিগন্ত : আপনার দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

মহুয়ী শারদ : আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো বহুস্তর বিশিষ্ট। আবাসন সঙ্কট তার একটি প্রকট উদাহরণ। লেডিস হল কিংবা সাব-হলের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়। বর্তমানে এমন একটি অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, সাব-হলে সিট না পেলে পরবর্তীতে মূল হলেও সিট পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সাব-হলের ভাড়া মেস ভাড়ার থেকেও বেশি। এসব সাব-হলে শিক্ষার্থীদের অমানবিক পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে। এমনকি শুরুতে সিট নেয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি বা এক ধরনের ভর্তি ফি দিতে হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এর বাইরে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে যে বাজেট পাস হচ্ছে, সেগুলোর অর্থ মূলত শিক্ষার্থীদেরই টাকা। কিন্তু সেই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটুকু ব্যয় হচ্ছে তা নিয়ে কোনো দৃশ্যমান স্বচ্ছতা নেই। আমি মনে করি, ক্যাম্পাসের বড় বড় সমস্যা আবাসন সঙ্কট, খাদ্য সঙ্কট, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে সৃষ্ট সঙ্ঘাতÑ এসবের মূল কারণ একটাই। আর তা হলো জবাবদিহি ও সুশাসনের অভাব।

নয়া দিগন্ত : এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

মহুয়ী শারদ : এসব সমস্যা বিবেচনা করেই আমরা আমাদের ইশতেহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা যুক্ত করেছি। সেটি হলো প্রতি মাসে কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনার আয়োজন করা।

এই সেমিনারে শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাদের সমস্যা, অভিযোগ ও প্রস্তাব তুলে ধরবেন। শাকসু এখানে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। আমরা এই বিষয়গুলো প্রশাসনের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করবো এবং জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসব। এই প্রশ্নগুলো তখন শুধু নির্বাচিত কয়েকজন প্রতিনিধির নয়, বরং পুরো সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে। ফলে প্রশাসন এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এ ছাড়া আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম চলতে দেয়া হবে না। গণরুম বা গেস্টরুম সংস্কৃতি পুনরায় ফিরে আসার যে আশঙ্কা রয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার উদ্যোগ নেয়া হবে। আমরা বিশ্বাস করি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসকে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার মাধ্যমে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব।

নয়া দিগন্ত : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

মহুয়ী শারদ : সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমার একটাই কথা, আমি আপনাদের সবাইকে ভোট দিতে দেখতে চাই। আপনি আমাকে ভোট দিন বা না দিন, কিন্তু অবশ্যই ভোট দিতে আসবেন। ভোট দেয়া আমাদের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার এবং একই সাথে দায়িত্ব। প্রতিটি প্রার্থীকে যাচাই-বাছাই করে, তাদের এজেন্ডা ও কাজের পরিকল্পনা বিবেচনা করে ভোট দিন। কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, সাস্টের শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক বা অধিকার বিষয়ে সচেতন নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই এই ধারণা ভুল। আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ভোট প্রদানের মাধ্যমেই আমরা প্রমাণ করব যে, সাস্টের শিক্ষার্থীরা সচেতন, দায়িত্বশীল ও অধিকার সম্পর্কে অবগত।

শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে দায়িত্ব পালন করব

শাকসু নির্বাচনে এককভাবে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন মামুনুর রশীদ শুভ। তিনি জুলাই আন্দোলনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলেন এবং আন্দোলনে আহত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ‘ভয়েস ফর জাস্টিস, সাস্ট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

 

নয়া দিগন্ত : আপনাকে কেন ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা?

মামুনুর রশীদ শুভ : আমি জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত সংগ্রামের মধ্যেই আছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি দেশের জন্য যারা জীবন দেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষের কতটা অভাব। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি ‘ভয়েস ফর জাস্টিস, সাস্ট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছি। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, আগে কাজ করে তার পর কথা বলায় বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বদলাতে হলে শুধু সুন্দর বক্তব্য যথেষ্ট নয় ধারাবাহিক ও বাস্তব কাজ প্রয়োজন। শিক্ষা, গবেষণা, পরিবেশ ও আবাসন প্রতিটি খাতে থিমভিত্তিক কাজ দরকার, আর সেই কাজটিই আমি করতে চাই।

আমি কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের সাথে যুক্ত নই। আমি কেবল শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবেই দায়িত্ব পালন করব। কোনো রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক ভয় কিংবা ক্ষমতার হুমকি আমাকে থামাতে পারবে না। কারণ আমি একবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি, মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যত শক্তিশালী হোক কিংবা সরকার যেই থাকুক শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যত চ্যালেঞ্জই আসুক, আমি শিক্ষার্থীদের পাশেই দাঁড়াব। আমাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলে একজন শুভ হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু ভয়েস ফর জাস্টিস থেমে যাবে না। এ লড়াই চলতেই থাকবে। আমি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, আর এই স্বতন্ত্রতাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার পাশে আছেন অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থী, যারা একজন নির্ভীক প্রতিনিধি চান। শিক্ষার্থীরা যদি মনে করেন আমি তাদের হয়ে কথা বলতে পারব, তাহলে তারা আমাকে ভোট দিক।

নয়া দিগন্ত : আপনার দৃষ্টিতে ক্যাম্পাসের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

মামুনুর রশীদ শুভ : বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ শিক্ষা, তবে এর সাথে সরাসরি জড়িত নিরাপত্তা, আবাসন, পরিবেশ, গবেষণা ও পরিবহন। আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে জরুরি সমস্যা হলো নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা। অনেক ছাত্রী জানিয়েছেন, সিলেট শহরে সিএনজিতে যাতায়াতের সময় তারা প্রায়ই হয়রানির শিকার হন। এর পরই আসে আবাসন সঙ্কট। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ব্যবস্থা নেই। ফলে অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। মেয়েদের সাব-হলগুলোতে মাসিক প্রায় দুই হাজার টাকা নেয়া হলেও সে অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নেই।

শিক্ষা ও গবেষণায় বড় পরিবর্তন দরকার। আমাদের পড়াশোনা অত্যধিক তাত্ত্বিক। বাস্তব প্রয়োগ ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি এবং গবেষণায় আগ্রহীদের জন্য ‘রিসার্চ স্কলার অ্যাওয়ার্ড’ চালু করা জরুরি। খাদ্য ও পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবহন ব্যবস্থায় রয়েছে বড় অনিয়ম। সন্ধ্যার পর নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি ঘণ্টায় বাস সার্ভিস চালু করা, রাত পর্যন্ত চলাচল এবং প্রতিটি হলে সরাসরি পরিবহন পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

মামুনুর রশীদ শুভ : আমি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, কোনো রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন নই। আমার একমাত্র শক্তি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, প্রক্টর, প্রভোস্ট ও সংশ্লিষ্ট দফতরে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা হবে। নির্বাচিত হলে আমি এই বৈষম্য দূর করব এবং হল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ভাতা চালুর উদ্যোগ নেবো।

শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ অর্থ এলে কোন খাতে, কতটুকু ব্যয় হচ্ছে এ তথ্য জনসমক্ষে আনা হবে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য।

নয়া দিগন্ত : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

মামুনুর রশীদ শুভ : শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমার একটাই কথাÑ যোগ্য, ত্যাগী ও নির্ভীক প্রতিনিধিকে মূল্যায়ন করুন। যারা অতীতে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, তাদের বেছে নিন। যারা সামনে এক কথা আর পেছনে আরেক কথা বলে, তাদের থেকে সতর্ক থাকুন। আপনারা যদি একজন সৎ ও সাহসী প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, সেই প্রতিনিধি সবসময় আপনাদের পাশেই থাকবে।