Image description
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সরব শিক্ষা মন্ত্রণালয়

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জেগে উঠেছে। একের পর এক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি কার্যক্রমে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দ্রুতগতিতে এসব কাজ শেষ করতে মরিয়া একশ্রেণির কর্মকর্তা ও তাদের সহচররা। যা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে চলছে তোলপাড়।

জানা গেছে, গত বুধবার থেকে নতুন করে ১ হাজার ৫০০ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এত বড় কর্মযজ্ঞ দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে কীভাবে শেষ করা হবে বা কেনই বা করতে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) শীর্ষ তিন পদে দ্রুতগতিতে নিয়োগ দিতে লোক খুঁজছে মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মাউশিতে দুজন পরিচালক ও এনসিটিবিতে দুজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক চলছে। সদ্য নিয়োগ পাওয়া চারজনের মধ্যে এনসিটিবির একজন সদস্য ও মাউশির একজন পরিচালক আওয়ামী মতাদর্শের কর্মকর্তা বলে অভিযোগ রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের আগের দিন (১১ ডিসেম্বর) রাতে দেশের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন দপ্তর-প্রতিষ্ঠানের ৫২৫ জন ক্যাডার কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন করা হয়। এই বদলি প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের পেছনে শিক্ষা উপদেষ্টা পিএসসহ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য শাখার কর্মকর্তা ও মাউশির কর্মকর্তাদের একটি ‘সিন্ডিকেট’ জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা উপদেষ্টার একান্ত সচিব ড. একেএম তাজকির-উজ-জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার কোনো অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকার আমার সুযোগ নেই। উপদেষ্টা ও সচিব শিক্ষার সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এই বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন শূন্য থাকা পদ পূরণ এবং শিক্ষক সংকট নিরসনের কথা বলে এসব কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ সরকারের শেষ সময়ে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে স্বচ্ছতা ও মান বজায় রাখা কঠিন। সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ করে এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইএমআইএস পোর্টালে অনলাইনে জমা দিতে হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, জমির দলিল, শিক্ষক-কর্মচারীদের সব সনদের কপি, দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারপত্র, টিডিসি রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়, যা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, যাচাই-বাছাই ও নিয়মিত পরিদর্শন করে এমপিওভুক্ত করতে স্বাভাবিকভাবে ৬ মাসের বেশি সময় লেগে যায়। সেখানে নির্বাচনের আগেই দ্রুততার সঙ্গে (এক মাসের কম সময়) মধ্যে এই কাজ শেষ করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একদিকে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত নিয়ে চলছে তোড়জোড়, অন্যদিকে এই কাজে আর্থিক লেনদেন না করতে বলছে মন্ত্রণালয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে কারও সঙ্গে যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেনে না জড়ানোর জন্য গত বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, এমপিওভুক্তির পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে। এতে কোনো ধরনের ম্যানুয়াল মূল্যায়নের সুযোগ নেই। গত ৭ জানুয়ারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির লক্ষ্যে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ওই গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেক যাচাই-বাছাই করে এমপিওভুক্ত করতে হয়। এখনই এসব কাজ করতে হবে কেন, কী প্রয়োজনে করতে হচ্ছে? আরও ৬ মাস পরে করলে তো কোনো অসুবিধা নেই।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষার সংস্কার করার কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না। নির্বাচনের সময় এখন চলতি দায়িত্ব পালন করবে। তড়িঘড়ি করে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখন নয়। আর মন্ত্রণালয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি শিক্ষার স্বার্থে না হয়ে ব্যক্তি স্বার্থে হয়। শিক্ষায় সিন্ডিকেট করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেটি এখনো বহাল রয়েছে বলে জানান তিনি। গত ৭ জানুয়ারি মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগে পরিচালক পদে নিয়োগে পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন। তিনি এর আগে ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকার ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক পদে দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আওয়ামী সরকারের সময়ে ভালো জায়গায় পোস্টিংয়ে ছিলেন। মাউশির প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক হয়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুস সবুর। তিনি এর আগে মাউশিতে ওএসডি ছিলেন।

এনসিটিবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাক্রম বিভাগের সদস্য পদে নিয়োগ পেয়েছে অধ্যাপক ড. একেএম মাসুদুল হক। তিনি এর আগে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তার পদত্যাগ দাবি করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। যদিও তিনি সমঝোতার মাধ্যমে পরে কলেজে ফেরত এসেছিলেন। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাক্রম বিভাগের সদস্য হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার।

এছাড়া শিক্ষা প্রশাসনে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন গত ১১ ডিসেম্বর। ওই রাতেই শিক্ষা ক্যাডারের ৫২৫ জন কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করা হয়, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন। একই দিনে আরও ২ হাজার ৭০৬ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯৯৫ জন অধ্যাপক এবং ১ হাজার ৭১১ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। পাশাপাশি ৯৪ জনকে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়। এই বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ও লোভনীয় পদে বদলির ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মহাপরিচালক, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) মহাপরিচালক পদ এই মুহূর্তে ফাঁকা রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগ করতে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বর্তমানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। নিয়মিত চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিতে যোগ্য কাউকে খুঁজছি। উপদেষ্টার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছে।