Image description
বেওয়ারিশ লাশের ৮ জন শনাক্ত

শেখ হাসিনা সরকারের বৈষম্য ও অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন রফিকুল ইসলাম। থাকতেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বোনের বাসায়। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। এরপর থেকে টানা আট মাস বিভিন্ন থানা, কারাগার, হাসপাতাল ও মর্গে রফিকুলের সন্ধান করেন স্বজনরা। কিন্তু রফিকুলকে জীবিত পাননি। একপর্যায়ে তার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দিকে ছোটেন স্বজনরা। বেওয়ারিশ লাশের ছবির স্তূপে খুঁজে পান জুলাই যোদ্ধা রফিকুলের সন্ধান। আরেক জুলাই যোদ্ধা কাবিল হোসেন একই বছরের ১ আগস্ট সকালে রাজধানীর মুগদার বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। তিনিও আর বাসায় ফেরেননি। এরপর থেকে টানা পাঁচ মাস হন্যে হয়ে তার সন্ধান করেন স্বজনরা। অবশেষে বেওয়ারিশ লাশের ছবির স্তূপে এই যোদ্ধার খোঁজ মেলে।

শুধু রফিকুল বা কাবিল হোসেনের স্বজনই নন, অন্য যেসব অজ্ঞাত শহীদ জুলাই যোদ্ধার পরিচয় শনাক্ত হয়েছে তাদের স্বজনরাও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। অনেক মা ছেলের ছবি নিয়ে হাসপাতাল, মর্গ বা কবরস্থানে সন্ধান করেছেন। স্ত্রী হন্যে হয়ে খুঁজেছেন স্বামীকে। সন্তান ছুটেছেন বাবার সন্ধানে। অবশেষে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন হওয়া লাশের ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হন, প্রিয় মানুষটিকে আন্দোলনের সময় হত্যা করা হয়েছে। শহীদদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফনকৃত ১১৪ জুলাই শহীদের মধ্যে এখনো ১০৬ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তাদের কোনো স্বজন এখনো লাশের সন্ধানে আসেননি। এসব লাশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং কবরের নাম্বারিংও করা হয়। ভবিষ্যতে কেউ লাশের দাবি করলে তাদের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের (মেলানো) মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হবে। লাশ শনাক্তের দায়িত্বে রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অজ্ঞাত এসব শহীদ জুলাই যোদ্ধার লাশের পরিচয় নিশ্চিতে করণীয় জানতে চাইলে গুমসংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য, মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, শহীদদের লাশের ছবি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রচার করা দরকার। মানুষের কাছে তথ্য আহ্বান করতে হবে। তার বাবা-মা এ ছবি না দেখলেও তাদের অন্য স্বজন বা পরিচিত কেউ ছবি দেখে শনাক্ত করতে পারবেন।

তিনি বলেন, এসব শহীদের মধ্যে অনেকে এতিমও থাকতে পারেন। তাদের বন্ধুবান্ধব নিশ্চয়ই আছেন। তারা ছবি দেখে শনাক্ত করতে পারবেন। সরকারকে এ ধরনের উদ্যোগ যত দ্রুত সম্ভব নিতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের ক্যাডারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া এসব অজ্ঞাত শহীদদের লাশের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ। ওই সময় তড়িঘড়ি করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) শাহবাগ থানার তত্ত্বাবধানে আঞ্জুমান মুফিদুলের মাধ্যমে মোট ১১৪টি লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এসব লাশের পরিচয় শনাক্তে কোনো উদ্যোগও নেয়নি শাহবাগ থানা পুলিশ। চাইলে পুলিশ লাশের ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করতে পারত। কিন্তু তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজস্ব দায়িত্ব ভুলে যায়। ফলে এসব লাশের কোনো স্বজন আজও পাওয়া যায়নি।

একাধিক শহীদের স্বজন যুগান্তরকে জানিয়েছেন, মৃত্যুর পর পুলিশ লাশের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা না করেই তড়িঘড়ি করে দাফন করেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করেছেন তারা। কবর শনাক্তে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে শাহবাগ থানায় জুলাই আন্দোলনের সময় দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এসএন মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কারও গাফিলতি থাকলে এটা অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি।’

এদিকে আঞ্জুমান মুফিদুলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহতের বিষয়টি শাহবাগ থানা পুলিশ দাফনের আগে তাদের অবগত করেনি। আঞ্জুমান মুফিদুলের লাশ দাফনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ১১৪টি লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে দাফন করা হয় রায়েরবাজার কবরস্থানে। এসব লাশ পুলিশ আমাদের দিয়েছিল। এদের মধ্যে আটটি লাশ গুলিবিদ্ধ ছিল যা আমরা পরে জানতে পেরেছি।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে লাশের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পুলিশ। জিডি নম্বর-৩০০। কবর থেকে লাশ তুলে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডি। পরে লাশের দাবিদারদের ডিএনএ ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে গত ৫ জানুয়ারি ৮ শহীদের কবর স্বজনদের বুঝিয়ে দেয় সিআইডি। এসব শহীদের বেশির ভাগই গুলিতে নিহত হন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত ৯ জন শহীদের পরিবার আবেদন করেছে। ডিএনএ ম্যাচিংয়ের মধ্যমে ৮ জনকে শনাক্ত করা গেছে। একজনের পরিবার প্রয়োজনীয় অ্যাভিডেন্স দিতে পারেনি। অবশিষ্ট ১০৬টি লাশের ডিএনএ স্যাম্পল আমাদের কাছে আছে। ভবিষ্যতে কেউ যদি এসে লাশের দাবি করেন তাহলে ডিএনএ স্যাম্পল নিয়ে কবর শনাক্ত করা হবে।

কবর বুঝিয়ে দিতে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ১১৪টি লাশ উত্তোলন করে ডিএনএ নমুনা নিয়ে ফের দাফন করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সরকারের সিদ্ধান্ত, আদালতের অনুমোদন এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতে গিয়ে সময় লেগেছে।

এদিকে শনাক্ত হওয়া জুলাই শহীদদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে সেই কঠিন সময়ের বিবরণ পাওয়া গেছে। কলেজ শিক্ষার্থী ফয়সাল সরকার ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। তার ছোট ভাই মো. ফরহাদ সরকার যুগান্তরকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিলেন ভাই। ১৯ জুলাই বিকাল ৫টার দিকে আন্দোলনে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হয়ে আর আসেননি।

তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে খুঁজেও কোনো সন্ধান মেলেনি আমার ভাইয়ের। পরে আমরা জানতে পারি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। নিখোঁজের প্রায় ১২ দিন পর রাজধানীর কাকরাইলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কার্যালয়ে গিয়ে ফয়সাল ভাইয়ের ছবি দেখে তাকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হই। ছবি শনাক্তের পর আঞ্জুমান মুফিদুল জানায়, রায়েরবাজার কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়েছে।

আরেক শহীদ আসাদুল্লার স্ত্রী ফারজানা আক্তার বলেন, আসাদুল্লার সঙ্গে ১৯ জুলাই বিকালে আমার শেষ কথা হয়। উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর কোনো খোঁজ পাইনি। ফোনটাও বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতাল, থানা ও লাশঘর সবখানেই খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। তার লাশ শনাক্ত করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শহীদ মাহিন মিয়ার স্ত্রী জেসমিন বলেন, ১৮ জুলাই রাতে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় মাহিন। ঢাকা মেডিকেল, মর্গসহ বিভিন্ন মেডিকেলে ও জেলখানায় খুঁজেছি।

যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মাদবাগের বাসিন্দা কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৮ জুলাই বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি। শহীদ সোহেলের ছোটভাই আলভি নাবিল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সোহেল ভাইকে প্রথমে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। পরে পেছন থেকে গুলি করা হয়। পরে সম্ভাব্য সব স্থানে খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। ৩৪ দিন পর ঢাকা মেডিকেল মর্গের এক কর্মীর কাছে থাকা লাশের ছবি দেখে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হই।

যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে যুক্ত শহীদ রফিকুলের দুলাভাই রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, রফিকুলের মা-বাবা নেই। ছোটবেলা থেকে আমার কাছে বড় হয়েছে। ১৮ জুলাই নিখোঁজের আট মাস পরে আঞ্জুমান মুফিদুলে বেওয়ারিশ লাশের ছবি দেখে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হই।

আরেক জুলাই যোদ্ধা পারভেজ ব্যাপারী ১৯ জুলাই সকালে রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন। আওয়ামী সরকারের পতনের ২২ দিন পর ঢামেক মর্গের এক কর্মচারীর মাধ্যমে লাশের ছবি দেখে নিশ্চিত হন পারভেজ আর বেঁচে নেই। পারভেজের বাবা সবুজ ব্যাপারী যুগান্তরকে বলেন, পারভেজের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে আঞ্জুমান মুফিদুলে গিয়ে জানতে পারি বেওয়ারিশ হিসাবে লাশ রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে অজ্ঞাত ৮ শহীদের পরিচয় শনাক্তের পর ৫ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদদের কবর বুঝিয়ে দেয় সিআইডি। কিন্তু ১০৬ লাশের সুরাহা এখনো হয়নি।