বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএফডিসি) বলা হয় চলচ্চিত্রের আঁতুড়ঘর। একটা সময় এফডিসি’র প্রতিটি ফ্লোর চলচ্চিত্র শিল্পী ও নির্মাতাদের পদচারণায় ছিল মুখরিত। সিনেমার শুটিং চলতো সকাল থেকে শুরু করে রাতভরও। ফ্লোরের শিডিউল পেতে অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। কিন্তু চলচ্চিত্রের সেই আঁতুড়ঘর এখন নানা অব্যবস্থাপনায় জড়সড়। জৌলুস অনেক আগেই হারিয়েছে সংস্থাটি। সিনেমার কাজ এখানে হয় হাতেগোনা। অনেক শুটিং ফ্লোরই এখন শুটিংয়ের অযোগ্য। বেশির ভাগ সিনেমার শুটিংই হয় এফডিসি’র বাইরে। বড় ঋণের জালে আটকা পড়ে আছে চলচ্চিত্রের মানুষদের পছন্দের এই জায়গাটি। সাত দশক আগে সিনেমার উন্নয়নে যাত্রা করেছিল এই সংস্থা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক দশকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার ঋণের জালে আটকা পড়েছে এফডিসি। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে সরকারের কাছ থেকে অনুদান আর ঋণ বাবদ প্রায় ৮০ কোটি টাকা নিয়েছে এফডিসি। কিন্তু ফলাফল তেমন একটা নেই। আয়ের তুলনায় ব্যয় কয়েকগুণ বেশি। তারপরও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সরকারের কাছে ১১৮ কোটি টাকার থোক বরাদ্দের আবেদন করেছে এফডিসি। এফডিসি’র আয় কমার বড় কারণের মধ্যে রয়েছে সিনেমার শুটিং এখানে কমে যাওয়া।
একটা সময় এফডিসিতে শুটিং ফ্লোর ছিল নয়টি। এর বাইরে ছিল- সুইমিংপুল, জমিদার বাড়ি, পুকুর, কৃত্রিম ঝরনাসহ আরও নানা শুটিং স্পট। কিন্তু এখন শুটিংয়ের জায়গা খুবই অল্প। এখানে শুটিংয়ের আগ্রহ হারিয়েছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। যার ফলে আয়ও কমেছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এফডিসি আয় করেছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩ হাজারের কিছু বেশি টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ৪৮ লাখ ৬৮ হাজার ৪০২ টাকা। ঘাটতির বাকি টাকা আনতে হয়েছে সরকারের কাছ থেকে। এক দশকে সরকারের অনুদান ও ঋণ মিলিয়ে ৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা নিতে হয়েছে এফডিসিকে। অন্যদিকে, এফডিসি’র স্থায়ী সম্পদ বলতে তেজগাঁও বেগুনবাড়ি মৌজায় (প্রধান কার্যালয়) রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩২৪ একর জমি। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সখিপুরে (বাংলাদেশ ফিল্মসিটি) ১০৫ দশমিক ৫৭৭ একর জমি রয়েছে। এ ছাড়াও মিরপুরের ভাষানটেকের এক একর জমি এবং চট্টগ্রামের এফডিসি’র বর্ধিত শুটিং ইউনিট তৈরির জন্য বিটিভি চট্টগ্রাম থেকে পাওয়া ১ দশমিক ৩৭ একর জমি দু’টিকে কাজে লাগানো যায়নি এখনো। অন্যদিকে, গত সরকারের আমলে ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়।
প্রকল্পটির কাজ অনেক কারণে পিছিয়ে যায়। সবশেষ প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুন ঠিক করা হয়েছে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি টাকা। এফডিসি’র ঋণজাল প্রসঙ্গে কথা বলতে এফডিসি’র এমডি মাসুমা রহমান তানিকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি। তবে এফডিসি’র অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন গুণী চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর। তিনি বলেন, একটা সময় এফডিসিতে শুটিংয়ের জন্য লাইন লেগে থাকতো। কিন্তু গত এক দশকের চিত্র ভিন্ন। এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। বাইরে গিয়ে সেসব কাজ করতে হয়। শুটিং স্পটও তেমন একটা নেই। আগে একটি ছবির শুটিং এফডিসিতেই শেষ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না। শুটিংয়ের জন্য বাইরে যেতেই হয়। সবমিলিয়ে এখানে শুটিংয়ে আগ্রহী নন প্রযোজক ও পরিচালকরা। তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিক হলে, শুটিং ফ্লোরগুলো পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করলে, মান অনুযায়ী বিভিন্ন সেবার মূল্য আরও কমালে- আমার মনে হয় এফডিসিতে শুটিংয়ের সংখ্যা বাড়বে, তাদের আয়ও বাড়বে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ‘আঁতুড়ঘর’ আরেক কিংবদন্তি নির্মাতা কাজী হায়াৎ বলেন, এফডিসিতে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। শুটিং নেই। মানুষজন নেই। সমিতির কিছু লোকজন শুধু। তিনি বলেন, আমরা বারবার ক্যামেরাসহ বিভিন্ন জিনিসের ভাড়া কমানোর কথা বলেছি। শুটিং স্পট উন্নয়নের কথা বলেছি। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা বলেছি। তিনি বলেন, এফডিসিতে এমন সব নতুন নতুন ক্যামেরা, লেন্স এসেছে- যা বাইরেও নেই। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রেট এখন কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে আরও কমানো জরুরি। সব দিক থেকে আধুনিকায়ন না করা গেলে এফডিসিকে আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব নয়।