ইসলামী আন্দোলন জোট ছেড়ে দেয়ায় নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শিবিরে। সমঝোতা না হওয়া ৪৭ টি আসনের কোন দল কতটা পাবে- এ নিয়ে জোটে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় জোটের ভোটে কী প্রভাব পড়বে এ নিয়েও ভাবছেন নেতারা। পরিস্থিতি নিয়ে গত দুইদিনে একাধিক বৈঠক হয়েছে। জামায়াতও শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ইসলামী আন্দোলনকে জোটে রাখতে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে।
ইসলামী আন্দোলন না থাকায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট কার্যত এখন ১০ দলের জোটে পরিণত হয়েছে। এই জোট সমঝোতার ভিত্তিতে ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ঘোষিত আসনের মধ্যে জামায়াত ১৭৯টি, এনসিপি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৭টি, এবি পার্টি ৩টি, বিডিপি ২টি এবং নেজামে ইসলাম ২টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে।
অবশিষ্ট আছে ৪৭ আসন। প্রথমিকভাবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য এই ৪৭ আসন রাখার কথা বলা হলেও শুক্রবার বিকালে ইসলামী আন্দোলন জানিয়েছে, তারা জোটের সঙ্গে থাকবে না এবং এককভাবে ২৬৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
জোট থেকে ইসলামী আন্দোলনের বের হয়ে যাওয়ায় ৪৭টি আসনে কারা প্রার্থী হতে পারেন তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা গেছে, এই আসনগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হবে। জোটের এক নেতা জানিয়েছেন, অবশিষ্ট ৪৭টি আসনের মধ্যে ৩৫-৪০টি আসনে প্রার্থী দেবে জামায়াত এবং বাকি ৭-১২টি আসন ভাগাভাগি করা হবে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও এবি পার্টিসহ অন্যান্য দলের মধ্যে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আন্দোলনরত যে ১০টি দল নির্বাচনী ঐক্য প্রক্রিয়ায় আছে তার একটা লিয়াজোঁ কমিটি আছে। সেই লিয়াজোঁ কমিটি এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত। উনারা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলো বা তাদের প্রস্তাবনাগুলো শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জানাবেন, তারপর সিদ্ধান্ত হবে।
১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে ইসলামী আন্দোলন। এজন্য তিনটি অভিযোগ জামায়াতের বিরুদ্ধে তুলেছে তারা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ১১ দল এখন ১০ দল। ইসলামী আন্দোলনের জন্য তো আমরা আসন রেখেছি, আমরা চেয়ারও রেখেছিলাম। আসনও আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম যে এতটা আসন আছে। বাক্স তো একটা এখনো আছে, এখনো সময় আছে। সেই সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে ইসলামী আন্দোলনের বেরিয়ে যাওয়ায় এনসিপি’র আসন বাড়ার সম্ভাবনা দেখছে দলটি। সেজন্য চেষ্টাও শুরু করেছেন তারা।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর জিগাতলায় এনসিপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিক্রিয়া জানান- দলের মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলনের জন্য ঐক্যে এখনো আলোচনার দরজা খোলা আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এনসিপি সমঝোতায় ৩০টি আসন পেয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই তারা ৩৫ থেকে ৪০টি আসন চাইছিল। সেই লক্ষ্যে ৪৭টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৫০টির মতো আসন ফাঁকা রাখার কথা ছিল। এখন যেহেতু তারা বেরিয়ে যাচ্ছে, ফলে এনসিপি’র আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে দলটি। এনসিপি’র আশা, তাদের আরও ১০ থেকে ১৫টি আসন বাড়তে পারে।
এদিকে চলমান পরিস্থিতিতে দলীয় করণীয় নির্ধারণে শনিবার জরুরি বৈঠকে বসেছে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ। সকাল ৯টায় রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়। সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈঠক চলছিল।
দুপুরে এক ফাঁকে এই বৈঠকে উপস্থিত হন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি বলেন, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। ভেঙে পড়া সমঝোতা ১২ই ফেব্রুয়ারির আগে ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আর বসা হবে না। জোট না টেকার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, জোট ভাঙার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র এখনো দেখছি না। নিজেদের নানা ব্যর্থতার কারণেই এ দূরত্ব হতে পারে। তবে আমাদের আরও আন্তরিক হওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তিনি দাবি করেন, শরীয়াহ্ আইনের বিষয়ে জামায়াত আমীরের বক্তব্য ভুল বুঝেছে ইসলামী আন্দোলন। শুক্রবার শরীয়াহ্ আইন বাস্তবায়ন না করার ঘোষণা এবং সমঝোতার নির্বাচনের দিকে জামায়াতে ইসলামী এগোচ্ছে বলে অভিযোগ করে ইসলামী আন্দোলন। এছাড়া বিভিন্ন সময় জামায়াতের থেকে দলীয়ভাবে ইসলামী আন্দোলন অপমানের শিকার হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তীতে গড়ে ওঠা জামায়াত- ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক সমঝোতা ভেঙে যায়। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে দলীয় প্রার্থীদের অনেকেই হঠাৎ করে নির্বাচনী মাঠে একা হয়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন বলে সূত্র জানায়।