ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য আসলে দায়ী কে? প্রথম দৃষ্টিতে এর উত্তর খুবই সহজ মনে হওয়ার কথা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. এস জয়শঙ্করই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ। অভিজ্ঞ ও বিশ্বভ্রমণকারী কূটনীতিক জয়শঙ্কর তার তীক্ষ্ন ও স্পষ্ট বক্তব্যের জন্য প্রায়ই শিরোনামে থাকেন। তবুও এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন এই গণমাধ্যম ও দক্ষ মন্ত্রীকেও নিশ্চয় ভাবতে হয়েছে, দক্ষিণ ব্লকে আসলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে?
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিভ্রান্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো- বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা। বিষয়টি একটু ভেবে দেখা যাক। ৩১শে ডিসেম্বর ড. জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যক্তিগত শোকবার্তা তুলে দেন খালেদা জিয়ার ছেলে ও তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে। যে মানুষটি হয়তো বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন, তার সঙ্গে করমর্দনের সেই ছবি কয়েক মাসের শীতল সম্পর্কের পর এক ধরনের উষ্ণতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান রহস্য
কিন্তু মাত্র দু’দিন পরই ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) আইপিএল ফ্র?্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয়, বাংলাদেশি তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় তালিকা থেকে বাদ দিতে। বেসরকারি ফ্র?্যাঞ্চাইজিটি কোনো প্রশ্ন না করেই নির্দেশ মেনে নেয়। এর জেরে বাংলাদেশ সরকার ও ক্রিকেট বোর্ড তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রতিবাদ হিসেবে পরের মাসে ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ না খেলার ঘোষণা দেয়।
তাহলে প্রশ্ন উঠছেই- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কী এমন বদলে গেল? একদিকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উষ্ণতা, অন্যদিকে হঠাৎ একজন ক্রিকেটারকে নিশানা করার অদ্ভুত সিদ্ধান্ত! দৃশ্যত একমাত্র পরিবর্তন ছিল তথাকথিত ‘ফ্রিঞ্জ’ হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর উচ্চস্বরে প্রচারণা যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলছে। এজন্য বাংলাদেশকে চাপ দিতে তারা জোর আহ্বান জানায় মোদি সরকারের প্রতি। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক সংগীত সোম সরাসরি কেকেআর’র মালিক শাহরুখ খানকে আক্রমণ করেন এবং মোস্তাফিজকে দলে নেয়ার জন্য তাকে ‘গাদ্দার’ বলে আখ্যা দেন। এই বিতর্কে বলিউড তারকাকে টেনে এনে তিনি সাময়িক প্রচারের আলো পান। তিনি অবশ্য কেকেআর’র অন্য মালিক, ব্যবসায়ী জয় মেহতা ও অভিনেত্রী জুহি চাওলার নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু পদবি যদি ‘খান’ হয়, তবে হিন্দুত্ববাদী উগ্রবাদীদের সহজ লক্ষ্য হওয়াটাই যেন নিয়তি।
ফ্রিঞ্জই কি আসল চালিকাশক্তি?
স্বাভাবিক সময়ে কোনো যুক্তিবাদী সরকার এই ধরনের ‘ফ্রিঞ্জ’ বক্তব্য উপেক্ষা করতো। কিন্তু ‘নতুন ভারতে’ ফ্রিঞ্জই এখন মূলধারায় পরিণত হয়েছে। ধর্মভিত্তিক বিষাক্ত রাজনীতিতে পুষ্ট সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মত্ত বাহিনীকে আর উপেক্ষা করতে পারে না। আর যখন এই অনলাইন উন্মাদনা স্পর্শকাতর পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন তা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এখানে ক্রীড়া ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার পুরনো যুক্তি আর খাটে না। উপমহাদেশে ক্রিকেট কেবল খেলা নয়- এটি ভারতের ‘সফ্ট পাওয়ার’-এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। বিসিসিআই ক্রিকেট দুনিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য চালায়; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্র ছেলে জয় শাহ্ আইসিসি’র সভাপতি। তিনি বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত না মেলানো থেকে শুরু করে এখন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বর্জন- সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় ক্রিকেট যেন সরকারের হয়ে বড়ভাইসুলভ আচরণ করছে। মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তও আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা করে নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ‘ফরমান’ হিসেবেই এসেছে।
আসলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে?
তাহলে আবারো সেই প্রশ্ন- ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করছে কারা? পেশাদার কূটনীতিকরা, নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গেরুয়া শিবিরের সংঘ পরিবার?
কূটনীতিকরা সাধারণত জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেন। কিন্তু রাজনীতিবিদদের এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সামনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন। তাই বাংলাদেশবিরোধী আবেগ উস্কে দেয়া ভোটের কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। যেখানে পরিণত কূটনীতি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার প্রতিবাদ করতো পরিশীলিত ও কৌশলী ভাষায়, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আবেগের ঢেউ তুলে শিরোনাম দখলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলাফল- ঢাকার সঙ্গে সেতু নয়, তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের দেয়াল; যা বাংলাদেশের উগ্রপন্থিদেরই শক্তিশালী করবে। ভাবুন তো, বাংলাদেশ যদি ভারতে খেলতে না এসে শ্রীলঙ্কাকে ‘নিরাপদ’ দেশ হিসেবে বেছে নেয়- কী লজ্জাজনক পরিস্থিতি হবে!
বাংলাদেশ একমাত্র উদাহরণ নয়। ২০২৪ সালে ছোট্ট মালদ্বীপের সঙ্গে টুইট যুদ্ধও অকারণ সংকট তৈরি করেছিল। একইভাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর তুরস্কের সংস্থা সেলেবির নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছিল হঠাৎ করেই- যা কূটনৈতিক বিচক্ষণতার অভাবই তুলে ধরে।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ গালওয়ান সংঘর্ষ পরবর্তী চীননীতি। টিকটক নিষিদ্ধ, চীনা পণ্য বয়কট- এসব আবেগী পদক্ষেপ আসলে চীনের জন্য কোনো প্রতিরোধই ছিল না। অথচ পাঁচ বছর পর বিজেপি-আরএসএস নেতৃত্ব চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদের সাদরে গ্রহণ করছে। কংগ্রেস করলে যা ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’, বিজেপি করলে তা হয়ে যায় স্বাভাবিক কূটনীতি। এ দ্বিচারিতা বিস্ময়কর।
পরিশিষ্ট: কয়েকদিন আগে একটি শপিংমলে দেখলাম তরুণরা সস্তায় সোয়েটার কিনতে ভিড় করছে। ট্যাগে লেখা- ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। একজন ক্রিকেটারকে টার্গেট করা যত সহজ, পোশাকশিল্পকে বর্জন করা ততটাই কঠিন।
(লেখক একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক। তার এ লেখাটি ইন্ডিয়া টুডে থেকে অনুবাদ)