ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস—কোনোটিই দেশে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা থামাতে পারেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের বছরগুলোতে যেভাবে খুনের ঘটনা ঘটেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে বলে উঠে আসছে পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যানে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখনও প্রশ্নের মুখে। সাধারণ নাগরিকদের ভাষ্য—সরকার যেই থাকুক, নিরাপত্তা তো সবারই প্রয়োজন। ঘরে-বাইরে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে সারা দেশের থানাগুলোতে ৩ হাজার ২১৪টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত করা হয়। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১২৬টি, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ২৩টি এবং ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৩২টিতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। আগস্ট মাসের প্রথম পাঁচ দিনসহ ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে থানায় হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৩টি। এর মধ্যে শুধু আগস্ট মাসেই মামলা নথিভুক্ত হয়েছে ৬২৬টি। অবশ্য আগস্টের এই তালিকায় ১৫৮টি মামলা রয়েছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
পুরোনো ঘটনার নতুন মামলা
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৩০০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত দেখানো হলেও এর মধ্যে ২৪টি মামলা যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার। একই ধরনের ২৯টি মামলা যুক্ত হয়েছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এবং এপ্রিল মাসে ১৯টি। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে মোট ২৩০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ওই সময়ে মামলা করার সুযোগ পাননি, কিংবা সাহস করেননি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গত দেড় বছর যা হলো
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে বার বার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও গত প্রায় দেড় বছরের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শহর কিংবা গ্রাম—সবখানেই প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়ে গেছে। কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ৫ আগস্টের পর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যে মানসিক ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এর সুযোগে অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা বেড়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালিত না হওয়াও হত্যাকাণ্ড বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে পুরোনো ও নতুন অপরাধী গ্রুপ আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। দিনে-দুপুরে হত্যাকাণ্ড, বাসা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। এ বিষয়ে গুম সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে যেসব হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি স্পষ্ট। অপরাধ দমনে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।’’ তার মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে— নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কঠোর, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা ও অভিযান যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছে, অপরাধ করেও পার পাওয়া যাবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও পুরোনো শত্রুতার কারণে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। তবে যে কারণেই অপরাধ ঘটুক না কেন, আইনের প্রয়োগ যদি কঠোর ও জোরালো না হয়—তাহলে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনও পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’’
পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে— এটিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবে দেখা হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও পরবর্তী সময়ে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। যেমন- ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে নথিভুক্ত ১৫৮টি মামলা বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সংখ্যার দিক থেকে দেখলে হত্যাকাণ্ড কমার স্পষ্ট কোনও প্রবণতা এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়—কোনটি রাজনৈতিক, কোনটি ব্যক্তিগত বা পূর্ব শত্রুতাজনিত।’’
সামনে জাতীয় নির্বাচন, এই প্রেক্ষাপটে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কা আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় পুলিশ আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার প্রবণতা কমাতে সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান আরও কঠোরভাবে পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’’