নির্বাচনী আসন সমঝোতা নিয়ে চরম মতবিরোধ দেখা দিয়েছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে। এ নিয়ে গত ক’দিন জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে চলছে ক্ষোভ-অভিমান। শেষ পর্যন্ত এই জোটের আসন সমঝোতা হবে কিনা এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়-অনিশ্চয়তা।
এমন অবস্থায় গতকাল আসন সমঝোতার ঘোষণা দিতে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের পর গুঞ্জন ওঠে এই জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন সরে যেতে পারে। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও জোট ছাড়তে পারে। বিকালে দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলন।
এদিকে চলমান পরিস্থিতে অধৈর্যশীল আচরণ বা অপ্রীতিকর কোনো কিছুতে না জড়ানোর জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে এ নির্দেশনা দেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মতবিরোধের মূলে আছে আসন বণ্টন। শুরু থেকে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে। সর্বশেষ তাদের দাবি ছিল ৫০টির বেশি। তবে জামায়াত দলটিকে ৪০টির বেশি আসন ছাড় দিতে চায় না।
একইভাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৫ থেকে ৩০টি আসন চাইলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসনে ছাড় দিতে চাইছে। প্রত্যাশিত আসন না পেলে যে কয়টিতে ছাড় দেয়া হবে না, সেখানে প্রার্থী উন্মুক্ত রাখতে চায় খেলাফত মজলিস।
দলীয় সূত্র বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথমেই ইসলামী আন্দোলন ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করে। এ সময় তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। ষষ্ঠ দল হিসেবে যোগ দেয় জামায়াত। এরপর জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) যুক্ত হয়।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, সম্প্রতি জামায়াত কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছে, যা অন্য দলগুলো ভালোভাবে নেয়নি। যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টিকে (এবি পার্টি) আসন সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে জামায়াত আলাদা করে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এ সব বৈঠকের আগে অন্য দলগুলোকে কিছুই জানানো হয়নি।
ইসলামী আন্দোলন মনে করে, ১০টি দলের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে জামায়াত আমীর জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে কথা বলেন। এটিকে ইসলামী আন্দোলনের অনেকে দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছেন।
পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার রাতে দীর্ঘ বৈঠক করেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। রাজধানীর রামপুরা এলাকার একটি মাদ্রাসায় হওয়া বৈঠকে দলীয় অনেক প্রার্থীও ছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকালও বৈঠক করেন নেতারা।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার বিকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ২০ তারিখ হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন হলো ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। এর আগপর্যন্ত যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।
জোটের আসন ভাগাভাগির টানাপড়েন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর বলেন, আশা করা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত সেটি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে গতকাল বৈঠক করে দলের সব স্তরের নেতাদের মতামত নেয়া হয়েছে। মাঠের তথ্য নেয়া হয়েছে, প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলতে মজলিসে আমেলার বৈঠক হয়েছিল।
‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামীর পথচলা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, দু’-একদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমীর বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। এ আলোচনা নির্বাচনের পরও হবে। জাতীয় সরকারের ব্যাপারেও তিনি কথা বলেছেন। জামায়াতের আমীর বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। তবে সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেয়া হয়েছে। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য বলেছেন জামায়াতের আমীর। এটা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে একটু সংশয় তৈরি করেছে, জামায়াত কি জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে?
জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কিনা, এমন প্রশ্নে গাজী আতাউর রহমান বলেন, এটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কি আমাদের? এটা এখানে যদি কেউ অ্যাডভান্টেজ পায়, সেটা পাইতে পারে।
নতুন করে বিএনপি’র সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো ফিক্সড করে ফেলেছে, তাদের জোট এবং তাদের যে ডিজাইন, সেটা তো হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, প্রশ্নে গাজী আতাউর বলেন, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাদের আলোচনা চলছে। আলোচনার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হবেন তারা।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা ভেস্তে গেছে, এমন পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র। তিনি বলেন, নির্বাচনী আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ন্যূনতম সমঝোতা যাতে থাকে, ইসলামী আন্দোলন সেই চেষ্টা করে যাবে।
এই জোটে জটিলতার ব্যাখ্যায় গাজী আতাউর বলেন, আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু সংকট আছে, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারও চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলনকে মেনে নিতে হবে, এই রাজনীতি তাদের দল অতীতেও করেনি। কেউ ইসলামী আন্দোলনকে অবহেলা করলে তাও তারা মেনে নিতে পারবেন না।
গাজী আতাউর বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে এগোতে চেয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। সমঝোতার মানে কেউ কারও ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। সেই পরিবেশ থাকলে আসন কমবেশি নিয়ে সমস্যা থাকতো না। তিনশ’ আসনেই একটি দল প্রচার করছে, জোটের পক্ষ থেকে তাদের দলের প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে। এসব মিথ্যাচার করলে তাদের সঙ্গে সামনে পথচলা কষ্টকর হয়ে যাবে।
এদিকে গতকালের সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়ে ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অনিবার্য কারণে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে।