ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ভোট দিতে ১৫ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। প্রবাসী এবং দেশে থাকা সরকারি কর্মচারী ও ভোটের কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কারাবন্দিরা পোস্টাল ভোট দেবেন। এই ভোট নিয়ে ইতিমধ্যে জালিয়াতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিও দেখে অনেকে বলছেন, এই ভোটে ভূতের আছর পড়েছে। প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোটের আয়োজন শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের প্রতীকের অবমূল্যায়ন হয়েছে দাবি করে নতুন করে ব্যালট ছাপানোর কথা বলছে বিএনপি। এ ছাড়া একসঙ্গে অনেক পোস্টাল ব্যালট নিয়ে প্রবাসীদের ভিডিও নিয়ে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, প্রতীক বরাদ্দের পর ভোটাররা ভোট দিয়ে তা প্রকাশ করে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করলে ভোটে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে এটি সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে বাধা হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোস্টাল ভোটে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা যাবে না এতে পুরো ভোট প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এই ব্যালটে জালিয়াতি হলে পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ এবং ফলাফল প্রক্রিয়াও ভেস্তে যেতে পারে। কারণ শতাধিক আসনে পোস্টাল ভোট দিতে গড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ভোটার আবেদন করেছেন। জালিয়াতি হলে এই ভোটাররা ভোটের ফলও পাল্টে দিতে পারেন। পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে প্রশ্ন উঠায় শুরুতেই নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন।
জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে ফেনী-৩ আসনে ১৬ হাজারেরও বেশি সংখ্যক প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন পোস্টাল বিডি অ্যাপে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজারেরও বেশি ভোটার পোস্টাল ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এভাবে শতাধিক আসনে গড়ে পাঁচ হাজারের বেশি সংখ্যক ভোটার নিবন্ধন করেছেন পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পোস্টাল ভোটই এসব আসনে নির্বাচনের ফল নির্ধারণের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। এই ভোট যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য ৩০০ সংসদীয় আসনে আগামী নির্বাচনের জন্য মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটারের পোস্টাল ভোট নিবন্ধন অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। বাকিরা দেশ থেকে নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্যে পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার-ভিডিপি’র সদস্য এবং ৬ হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় আসনভিত্তিক। সাধারণত আসনগুলোতে জয়-পরাজয়ে ভোটের ব্যবধান বেশ বড় থাকে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল ৩০টি আসনে।
এবার আসনভিত্তিক হিসাবে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসন আছে ১৮টি। এর মধ্যে একটি ছাড়া সব আসনই চট্টগ্রাম বিভাগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৩৮ জন। সাড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো চট্টগ্রাম-১৫ (১৪ হাজার ২৭২), কুমিল্লা-১০ (১৩ হাজার ৯৩৮), নোয়াখালী-১ (১৩ হাজার ৫৯২), নোয়াখালী-৩ (১২ হাজার ৭৪৫) এবং ফেনী-২ (১২ হাজার ৫৪১) আসন।
১০ হাজারের বেশি ও সাড়ে ১২ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো- কুমিল্লা-৪, ৫, ৬, ৯ ও ১১, সিলেট-১, চাঁদপুর-৫, নোয়াখালী-৪ ও ৫, ফেনী-১, কক্সবাজার-৩ ও লক্ষ্মীপুর-২ আসন।
এ ছাড়া ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন আছে ৯৭টি। বাকি আসনগুলোতে পোস্টাল ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ হাজারের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ১ হাজার ৫৪৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন বাগেরহাট-৩ আসনে। এদিকে ৪৬টি আসনে পাঁচ হাজারের বেশি এবং ৬৬টি আসনে চার হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেন। সব মিলিয়ে ১১৬টি আসনে পাঁচ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট, যা ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি জানান, যেসব আসনে পোস্টাল ভোট ১০ হাজার বা তার বেশি, সেখানে এই ভোট ফলাফলকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে এই ১০ হাজার ভোটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ যদি একজন প্রার্থী পান, তাহলে তা ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পোস্টাল ভোটের এই বিশ্লেষণে ফল নির্ধারণের নিয়ামক হতে পারে বলে মনে করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও। তিনি বলেন, কোনো আসনে পোস্টাল ভোট বেশি হলে ফলাফলে তা প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপি’র অভিযোগ: বাহরাইনে প্রবাসী এক জামায়াত নেতার বাসায় দুই শতাধিক পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। একইসঙ্গে পোস্টাল ব্যালট নতুন করে ছাপানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান- তিনি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘পোস্টাল ভোটে প্রবাসীদের অধিকারের দাবি আমাদেরও ছিল। অনেক আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট ৫-৭ হাজার। অনেক আসনে পোস্টাল ভোট ফলাফলে নিয়ামক হতে পারে। কিন্তু প্রবাসীদের কাছে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রথম লাইনে দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলি এবং হাতপাখা প্রতীক রয়েছে। কিন্তু বিএনপিরটা মাঝে, যা ভাঁজ পড়লে অস্পষ্ট হয়ে যাবে, ধানের শীষ দেখা যাবে না। এই ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ইসি অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছে, তারা বিষয়টি জানে না। তাদের দাবি, অক্ষরের ধারাবাহিকতায় এটি সাজানো হয়েছে। কিন্তু এটি অন্যভাবেও সাজানো যেতো। যারা দায়ী তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে যে আলোচনা: এদিকে বাহরাইনের ঠিকানার পোস্টাল ব্যালট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় চলছে নানা আলোচনা। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক পোস্টাল ব্যালট কয়েকজন মিলে গুনছেন। পোস্টাল ব্যালটের খামে ঠিকানা লেখা রয়েছে বাহরাইনের।
এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি আশা করবো এই ভিডিওটা যেন মিথ্যা হয়। এ ধরনের ভিডিও যদি সত্যি হয় তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এ বিষয়ে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, সেখানে ১৬০টি ব্যালট ছিল। কোনো খাম খোলা হয়েছে- এ রকম কিছু ভিডিওতে দেখা যায়নি। বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বিষয়টি দেখছেন। পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনুসরণীয় পদ্ধতির ব্যতিক্রম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে জানাবে বাহরাইনের ডাক বিভাগ (বাহরাইন পোস্ট)। ইসি সচিবের ভাষায়- পোস্টাল ভোটের ব্যালট পাওয়ার আনন্দটুকু ধরে রাখতে কেউ এটা ভিডিও করে পোস্ট করেছেন। তবে এটা করা উচিত হয়নি। তিনি বলেন, ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে ইসি পোস্টাল ব্যালটগুলো পাঠাচ্ছে। একেক দেশে পোস্টালব্যবস্থা একেক রকম। বাহরাইনের ক্ষেত্রে ১৬০টি পোস্টাল ব্যালট কোনো এক জায়গায় বক্সে (পিজিয়ন হোলের মতো) দেওয়া হয়েছে। ইসি সচিব বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বাহরাইন পোস্টকে জানানো হয়েছে। তারা সরজমিন তদন্ত করে জানাবে, এটা কেন ঘটলো। তাদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা ছিল, সেখানে কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না।
বিএনপি অভিযোগ করেছে, পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক এমনভাবে রাখা হয়েছে প্রতীকের মাঝখানে ভাঁজ পড়ছে। এটা ইচ্ছাকৃত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, তিনি যতটুকু জানেন, তা হলো প্রতীকের যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের ক্রম সাজানো হয়েছে।