Image description
৬ হাজার কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ৮৩ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত

খেলাপি ঋণের লাগাম টানার পাশাপাশি নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে ঋণগ্রহীতা বাছাই করা ও খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার মধ্য দিয়ে সাময়িক হিসাবে বড় অংকের মূলধন ঘাটতি মিটিয়ে মূলধন উদ্বৃত্ত করতে পেরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি। একই সঙ্গে সংস্কার, বিশেষ পরিকল্পনা ও ঋণ আদায় জোরদার করায় সোনালী ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে গেছে বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান। তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা অনেক বেশি। এই আস্থার কারণেই তারা বেশি আমানত রাখে। গতকাল মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মো. শওকত আলী খান বলেন, ২০২৫ সালে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মূলধন ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে এনে উদ্বৃত্ত করতে পারা। ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বৃহৎ এই ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, এই ঘাটতি পুরোপুরি মিটিয়ে ৮৩ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। গতবছরের মতো পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে ২০২৬ সালে সোনালী ব্যাংকের বাফার মূলধনের পরিমাণ বেড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন শওকত আলী। গত ৩১ ডিসেম্বরের সাময়িক তথ্য অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি নেই, বরং প্রায় ৬ কোটি টাকার ছোট একটি উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত বছরের শেষ দিনে ব্যাংকটির প্রভিশন দরকার ছিল ২৩ হাজার ৮ কোটি টাকা, যার বিপরীতে প্রকৃত প্রভিশন রয়েছে ২৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক ২০২৫ সালে পরিচালন মুনাফা করেছে ৮ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, আগের বছরের (২০২৪ সালের) নিরীক্ষিত হিসাবে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পরিচালন মুনাফার হার বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আমরা খেলাপি ঋণ বাড়তে দেইনি। বরোয়ার (ঋণগ্রহীতা) সিলেকশনে খুবই কেয়ারফুল ছিলাম এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্তরে অনেকগুলো কমিটি কাজ করেছে। এতে সফলতা এসেছে বলে উল্লেখ করেছেন মো. শওকত আলী খান।

সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। যা ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত হিসাবের ১৮ দশমিক ২০ শতাংশেরও চেয়েও কম হয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও ১৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। গতবছর সোনালী ব্যাংক খেলাপি ঋণ থেকে আদায় করেছে ৪ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ আদায়ের পরিমাণ ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। সে তুলনায়, আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, এর মধ্যে নগদ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫৮০ কোটি টাকা।
গত সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কাছে সোনালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। এই টাকার বিপরীতে সোনালী ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বন্ড ইস্যুর অনুরোধ করলেও তা এখনো দেয়নি মন্ত্রণালয়। ফলে এই ঋণের বিপরীতে সোনালী ব্যাংককে ৩০০ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্য ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ৯৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকার এলসি খুলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। সাধারণত এলসি কমিশন শতকরা ৪০ পয়সা হলেও এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার কমিশনের হার কমিয়ে ৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। এই হিসাবেও রূপপুর প্রকল্পের এলসি খোলার কমিশন বাবদ সরকারের কাছে সোনালী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ১,৫০০ কোটি টাকা। এলসির কমিশন পেলে সোনালী ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ আরো বাড়তো বলে জানান শওকত আলী খান।

২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানতের হার ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ঋণ ও অ্যাডভান্স ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আমানত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের এমডি জানান, ডিপোজিট বাড়ানোর জন্য গতবছর আমাদের কোনো বিশেষ স্কিম চালু করা বা টার্গেট দেয়া হয়নি। এরপরেও আমানতের এই প্রবৃদ্ধি সোনালী ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ারই প্রতিফলন।

২০২৬ সালে মানসম্পন্ন ঋণ বিতরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে ব্যাংকটি। এছাড়া, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ কমিয়ে বাণিজ্যিক ঋণে গুরুত্ব দেয়া হবে। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে (সিএমএসএমই) গুরুত্ব দেয়া হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের মতোই নতুন বছরে ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিল সুবিধা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথা জানান সোনালী ব্যাংকের এমডি।

২০২৫ সালে নীতি-সহায়তা কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট নিয়ে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে খেলাপি ঋণ না বাড়ে এবং আর যাতে ‘হলমার্ক গ্রুপ’-এর মতো কোনো ঋণ কেলেঙ্কারি সৃষ্টি না হতে পারে, সে ব্যাপারে তার ব্যাংক সতর্ক থাকবে বলে উল্লেখ করেন শওকত আলী খান।

মতবিনিময় সভা শেষে তিনি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন এবং ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংকের পারফরম্যান্স আরো উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।