Image description
এক বছরে দুর্ঘটনায় নিহত সহস্রাধিক শিশু স্পিড ব্রেকার, জেব্রা ক্রসিংসহ নানা উদ্যোগের কথা হলেও থেমে আছে সবই

দেশের সড়কগুলো যেন ক্রমেই শিশুদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। স্কুলে যাওয়ার পথে, খেলতে গিয়ে, কিংবা বাবা-মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশুর জীবন কেড়ে নিচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে নানা সময় আন্দোলন, প্রতিশ্রুতি আর নীতিমালার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি।

শিশু অধিকারকর্মী ও সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের একটি বড় অংশই শিশু। কিন্তু এই মৃত্যুর হিসাব অনেক সময়ই রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে উঠে আসে না। ফলে নীতিনির্ধারকদের কাছে সমস্যার ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় এবং বসতবাড়ির আশে-পাশের সড়কে খেলাধুলার সময় নিহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। পথচারী হিসেবে শিশুরা গ্রামীণ সড়কে বেশি হতাহত হচ্ছে। কারণ গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ি ঘেঁষা। ঘরের দরজা খুললেই সড়ক। এসব সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকে না। ফলে যানবাহনসমূহ বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। আবার শিশুরাও সড়ক ব্যবহারের কোনো নিয়ম-নীতি জানে না। এই অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলছেন তারা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, গত ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাস থেকে ১৭ বছর বয়সী এক হাজার আটজন শিশু নিহত হয়েছে। সড়ক ও সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন বিষয়ে অসচেতনতার কারণে শিশুরা সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় হতাহত হচ্ছে। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও চালক, হেলপার হিসেবে নিহত হয়েছে ৫৩৭ জন শিশু (৫৩ দশমিক ২৭ শতাংশ), পথচারী হিসেবে বিভিন্ন যানবাহনের চাপা-ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৪৭১ জন শিশু (৪৬ দশমিক ৭২ শতাংশ)। বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপা-ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১৮৭ শিশু (৩৯ দশমিক ৭০ শতাংশ)। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জীপের চাপা-ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩২ শিশু (৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ)। থ্রি-হুইলার ও নসিমন-ভটভটির চাপা-ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১৯৮ শিশু (৪২ দশমিক ০৩ শতাংশ)। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৫৪ শিশু (১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ)।

শিশু নিহত হওয়া সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহাসড়কে ২৮১ শিশু (২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ), আঞ্চলিক সড়কে ৩৬৪ শিশু (৩৬ দশমিক ১১ শতাংশ), গ্রামীণ সড়কে ২৯১ শিশু (২৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ) এবং শহরের সড়কে ৭২ শিশু (৭ দশমিক ১৪ শতাংশ) নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনাসমূহ ভোরে (২৭টি) ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সকালে (২৬৯টি) ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, দুপুরে (২৮৩টি) ২৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, বিকালে (২৬১টি) ২৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ, সন্ধ্যায় (৯২টি) ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং রাতে (৭৬টি) ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঘটেছে। এক মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ১৭৯ জন (১৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ), ৬ বছর থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৩৮২ জন (৩৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ) এবং ১৩ বছর থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৪৪৭ জন (৪৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ)।

জানা যায়, প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে একইভাবে থেমে যাচ্ছে শিশুর জীবন। দেশে সড়ক পরিবহন আইন, শিশু অধিকার আইনসহ একাধিক আইন রয়েছে, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে এসব কাগজেই থেকে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। স্পিড ব্রেকার, জেব্রা ক্রসিং, আইন সংশোধন অনেক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই উদ্যোগ থেমে গেছে।

স্কুলের সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, ফুটপাথ দখল ও ভাঙাচোরা অবস্থা, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনা, শিশুদের জন্য আলাদা সড়ক নিরাপত্তা পরিকল্পনার অভাবে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে। দেশের অধিকাংশ স্কুলের সামনে নেই স্পিড ব্রেকার, নেই ট্রাফিক পুলিশ, নেই জেব্রা ক্রসিং বা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। এসব নানা সমস্যায় প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

গত ১২ জানুয়ারি মহেশখালীর শাপলাপুর থেকে ছোট মহেশখালী সড়কে টমটম গাড়ির দুর্ঘটনায় মিনহা নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি সড়কের পাশ দিয়ে চলাচল করছিল। এ সময় দ্রুতগতির একটি টমটম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় শিশুটি সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সড়ক দুর্ঘটনায় জাহিদ ইবনে জামান নামে নয় বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে গত ১৩ ডিসেম্বর। হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিউ ফিলিং স্টেশনের পূর্ব পাশে খান মার্কেটের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সিএনজিতে থাকা শিশুটি ছিটকে সড়কে পড়ে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের চাকা শিশুটির মাথার ওপর উঠে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

গত ১৯ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ইজিবাইক রাস্তার পাশের গাছে সজোরে আঘাত করে উল্টে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ইজিবাইকটিতে থাকা তানিয়া আকতার নামে ১০ বছরের এক শিশু ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হয় এবং পরে তার মৃত্যু হয়। ভোলার চরফ্যাসনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মুনতাহা নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু নিহত হয়। এটা শুধু মহেশখালী, চকরিয়ায় ও সিংগাইরে নয়, এ চিত্র প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে।

রাজধানীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, প্রতিদিন আমরা আতঙ্কে থাকি। স্কুল ছুটির সময় বাচ্চারা যখন বের হয় তখন রাস্তায় বাস-ট্রাক এমন গতিতে চলে যে কিছু হলে সামাল দেওয়া যায় না। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে গেটের সামনে রাস্তা পার করানোর চেষ্টা করেন তবে তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রতিদিন সকাল ছয়টায় অফিসে যাবার জন্য বের হই। মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় পাই না। বেশিরভাগ সময় মেয়ে একা একা স্কুলে যাওয়া-আসা করে। নিজের মধ্যে আতঙ্ক-ভয় কাজ করে। তবে কি করবো অফিসে যাওয়া ও মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।