আহসান মোহাম্মদ
সামনের নির্বাচনে যে ব্যাপক ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে যাচ্ছে, তার লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হলে বাংলাদেশ এক গভীর সংকটে পতিত হবে। জরিপে দেখা গেছে, এবার প্রধান দুটি দলের জনসমর্থন কাছাকাছি। ফলে সামান্য ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে আসনসংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন হবে। অধিকাংশ আসনে পাঁচ-দশ শতাংশ ভোটের ব্যবধান থাকে। ফলে দেখা যাবে, ফলাফল ২০১৪ বা ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো হয়ে গেছে। এই ধরনের ফলাফল দেশে বা বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না, যার পরিণতি খুব খারাপ হতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, আওয়ামী লীগ, তাদের আশ্রয়দাতা দেশ এবং অন্য বিভিন্ন শক্তি প্রাণপণ চেষ্টা করবে এই নির্বাচনকে বানচাল বা অগ্রহণযোগ্য করে নিষিদ্ধ দলটির ফিরে আসার পথ তৈরি করতে। এ কারণে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী দলসহ সবার উচিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্ভাব্য কৌশল সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং একে প্রতিহত করা। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০০৬ সালের নির্বাচনকে বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারিং করা যেমন চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, এবারও সেরকম হতে পারে।
আসুন দেখা যাক, এবার কীভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে—
১. নির্বাচনের দু-এক দিন আগে অপছন্দের দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা বা গ্রেপ্তারের আতঙ্ক ছড়ানো খুবই কার্যকর এবং বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। এর ফলে ওই দলের নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া হয়ে যান এবং তাদের নির্বাচনি ব্যবস্থা ভন্ডুল হয়ে যায়। সব জায়গায় ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তারা কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারে না এবং তাদের সমর্থক অনেক ভোটারও ভোট দিতে যায় না। এই ঘটনাটি এত দ্রুত এবং সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে করা হয় যে, সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ে। এই পদ্ধতিতে ইঞ্জিনিয়ারিং করলে অনেক ক্ষেত্রেই তার কোনো প্রমাণ থাকে না এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ হয়েছিল।
২. নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখল, বিশেষ কোনো দলের সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে না দেওয়া, কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়া—এসব উপায়েও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়। এসব পদ্ধতি সাধারণত অল্প কিছু এলাকায় প্রয়োগ করা হয়; বিশেষ করে সেসব আসনে, যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. ভোট গণনার সময় ফলাফল পালটে দেওয়াও একটি প্রচলিত পদ্ধতি। ভোট গণনার সময় পোলিং এজেন্টদের সরিয়ে দিয়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পোলিং এজেন্টদের সরানোর জন্য গুজবপূর্ণ আতঙ্ক ছড়ানো হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করা হয়।
৪. রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানোর সময় কেন্দ্রের ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়া হতে পারে। প্রতিটি আসনে প্রায় ১৫০টি ভোটকেন্দ্র থাকে। রিটার্নিং অফিসারের কাছে ফলাফল আসে অনেক রাতে। এজেন্টরা তখন খুব ক্লান্ত থাকেন এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ও ঠিকমতো থাকে না। ফলে এত কেন্দ্রের মধ্যে কিছু কেন্দ্রের ফলাফল পাল্টে দিলে অনেক সময় তা ধরা যায় না।
৫. অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে রিটার্নিং অফিসার যোগফলে পরিবর্তন করে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করতে পারেন।
৬. রিটার্নিং অফিসারদের কাছ থেকে ফলাফল সংগ্রহের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একজন উপসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা টেলিফোনে ফল সংগ্রহ করেন। রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে যোগসাজশে তারা ফল পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন।
৭. সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয় নির্বাচনের মাস খানেক আগে থেকে। প্রশাসনের আচরণ, মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের গতিবিধি মিলিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে জনগণ ভাবে—‘অমুক দল জিতবে।’ এর ফলে ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং অন্যান্য গোষ্ঠী, যাদের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তারা সেই দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। দোদুল্যমান ভোটারদের একটি বড় অংশ তখন সেই দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে রাষ্ট্রযন্ত্র। বাংলাদেশের প্রশাসন ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রশাসনের সংস্কারে কোনো কার্যকর উদ্যোগও নেয়নি। এ অবস্থায় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কত ব্যাপক হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।