Image description
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের অর্থায়ন

উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের স্বপ্ন পূরণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি বিরাজ করছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকর করতে চীনের কাছে চাওয়া ঋণের বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আমলে চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হচ্ছে না। এতদিন ভারত না চীন এ নিয়েই ছিল দোটানা। গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ চায়। কিন্তু যে কোনো প্রকল্পের ঋণ চুক্তির ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতিতে এগোতে চায় দেশটি। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বুধবার যুগান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত চীনের কাছে চাওয়া ঋণের কোনো আপডেট আমার জানা নেই। এক কথায় বলতে গেলে নতুন কিছু এখনো হয়নি। কবে নাগাদ ঋণ চুক্তি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তির বিষয়ে কিছু জানি না।

সূত্র জানায়, প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজাহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তা পার হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী। চীনের হোয়াংহো নদীকে একসময় বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতিবছর ওই নদীর পানি ভাসিয়ে দিত শত শত মাইল জনপদ। ভেঙে নিয়ে যেত বহু গ্রাম-পথ-ঘাট জনপদ। নদীশাসন করায় (পরিকল্পিত ড্রেজিং) চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে। হোয়াংহো এখন হয়ে গেছে চীনের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। হোয়াংহোর মতোই এখন বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের ‘পাগলা নদী’খ্যাত তিস্তা ড্রেজিং করে কোটি মানুষের দুঃখ ঘোচানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে এই অঞ্চলের মানুষ। সূত্র আরও জানায়, ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’-এ অর্থায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত ২৬ মে একটি চিঠি পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। চিঠিতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে জুলাই মাসে চীনা দূতাবাসে ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠায় ইআরডি। এ চিঠিতে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রকল্পের ডিপিপি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

তিস্তা প্রকল্পের প্রস্তাব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) আমরা পাইনি। কবে নাগাদ আসতে পারে সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে ঋণের প্রস্তাব পাওয়ার পর চীন সরকার চুক্তির একটি খসড়া তৈরির কাজ শুরু করেছে। সেটি এখনো ইআরডিতে পাঠায়নি চীন। এরই মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কথা। সেটি হলেই এরপরই আসবে ঋণ চুক্তির বিষয়। তবে চীন যে কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করতে প্রক্রিয়াগত কারণে বেশ খানিকটা সময় নেয়। তারা ভালো করে দেখে এই ঋণে নেওয়া প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য কতটা উপকারী বা কতটা রিটার্ন পাওয়া যায়।

সূত্র জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এর আগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। সেটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্য। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বাড়বে। বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে ভাসাবে না গ্রামগঞ্জের জনপদ। সারা বছর নৌচলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। এতে আছে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দুপারে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধার ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। নৌবন্দর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই পারে থানা, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা।