Image description
উত্তর সিটির স্ট্রিট লাইট পোল সরবরাহ ও স্থাপন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারের ক্রয় নীতি না মেনে বৈদ্যুতিক পোল, বাতি ও স্ট্রিট লাইট পোল সরবরাহ ও স্থাপনের কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি দরপত্রে ৩৫ কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রদানের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

জানা গেছে, দরপত্রে যে ধরনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে, কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সেই অভিজ্ঞতা ছিল না। কার্যাদেশের শর্তের আলোকে বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএনসিসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এতে ক্রয় নীতি অনুসরণ করা হয়নি উল্লেখ করে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিকে (বিপিপিএ) চিঠি লেখে ডিএনসিসি। লিখিত জবাবে বিপিপিএ জানায়, মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্বে আইন, বিধিমালা, দরপত্রের বিধান ও শর্তাদি অনুসরণ করে দরপত্র মূল্যায়ন করে। অর্থাৎ ডিএনসিসি’র দরপত্রের শর্ত শিথিলের আবেদন নাকচ করে বিপিপিএ।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত সর্বোচ্চ অথরিটি বিপিপিএ। সেই অথরিটির নির্দেশনা এবং আইন অমান্য করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক। বিপিপিএ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে অনিয়ম পরিষ্কার হবে বলে মনে করেন তারা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বৈদ্যুতিক পোল এবং বাতি স্থাপনের কাজ করে প্রোর লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি ই-জিপি (আইডি ১১৪২২২০ নম্বর) দরপত্রে অংশ নেয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর দরপত্রের আলোকে একটিমাত্র আবেদন জমা পড়ে। এতে দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চেয়ে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ নিম্নদর পাওয়া যায়। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সব যোগ্যতা ঠিক থাকলেও কাজের অভিজ্ঞতা হিসাবে ১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে; যেটা দরপত্রের চাওয়া টাকার চেয়ে ৭০ লাখ টাকা কম। এই শর্ত শিথিল করার জন্য ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠির জবাব ইতিবাচক না হলেও ডিএনসিসি কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়।

জানা যায়, গত বছরের ১৮ নভেম্বর ডিএনসিসি থেকে পাঠানো পত্রের জবাব দিয়েছে বিপিপিএ কর্তৃপক্ষ। বিপিপিএর পরিচালক অপর্ণা বৈদ্য স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়-পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০০৮ এর বিধি-৮(১০)-এর বিধি ১১(১০)-এ উল্লেখ রয়েছে যে, মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ দায়িত্বে আইন, বিধিমালা এবং দপ্তরের বিধান ও শর্তাদি অনুসরণক্রমে দরপত্র মূল্যায়ন করবে। এছাড়া, বিধি-৯৮(৪) পিপিআর, ২০২৫-এর বিধি ১১৮(৪) অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটি কৃতকার্য দরদাতা চিহ্নিতকরণের জন্য দরপত্র দলিলে উল্লিখিত শর্তের ভিত্তিতে দরপত্রের মূল্যায়ন ও তুলনামূলক বিচার করবে। এই অবস্থায় উল্লিখিত বিধান অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এই জবাব অনুযায়ী কম অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া যায় না।

ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ আগস্ট ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া অঞ্চল-৫ এর আওতায় জাহাঙ্গীর গেট থেকে ফার্মগেট, বিজয় সরণি (পূর্ব ও পশ্চিম), খেজুর বাগান, বিজয় সরণি বিমানবন্দর থেকে খামারবাড়ি এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত ডেকোরেটিভ (আলংকারিক) স্ট্রিট লাইট পোল সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করেন। এই কাজের আওতায় স্মার্ট এলইডি লাইট, সিএলএমএস, কেবল এবং সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আর দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহে ন্যূনতম পাঁচ বছরের সাধারণ অভিজ্ঞতা থাকার কথা। পাশাপাশি গত ১০ বছরে অন্তত ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি একক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া দরদাতা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম সরবরাহ বা উৎপাদন সক্ষমতা প্রতি বছর ডেকোরেটিভ পোল ৩৭৫টি এবং স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট ৬১৫টি নির্ধারণ করা হয়।

অভিজ্ঞতা সনদ উপযুক্ত না থাকা সত্ত্বেও ডিএনসিসির দরপত্র যাচাই কমিটি গত ১৯ নভেম্বর প্রোটোস্টার লিমিটেডকে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বাতি স্থাপনের কার্যাদেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা যায়। পরে গত ৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া যুগান্তরকে বলেন, দরপত্রের শর্ত মোতাবেক কোনো ত্রুটি থাকলে সরকারের ক্রয় নীতি অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয় না। তবে বিদ্যুতের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান কম থাকায় প্রোটোস্টারের ব্যাপারে ইতিবাচক চিন্তা করা হয়েছে।

অন্যদিকে একই দিনে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের আরেক নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম অঞ্চল-৩ এর বনানী ফ্লাইওভার থেকে মহাখালী ফ্লাইওভার হয়ে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়ক বাতির খুঁটি সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য আরেকটি দরপত্র আহ্বান করেন। এই দরপত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা, গত ১০ বছরে অন্তত ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার একক কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা এবং প্রতি বছরে ডেকোরেটিভ পোল ২৩৫টি ও স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট ৩৯৫টি সরবরাহ বা উৎপাদন সক্ষমতার শর্ত দেওয়া হয়। দরপত্রেও প্রোটোস্টার লিমিটেড অভিজ্ঞতা সনদ কম থাকা সত্ত্বেও গত ১৯ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে ৪ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। এ বিষয়ে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, লিখিত আবেদন করলে তিনি লিখিত জবাব দেবেন। এছাড়া তিনি কোনো কথা বলবেন না। এ বিষয়ে প্রোটোস্টার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আকরাম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার নম্বরে কল দিয়ে এবং ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও কোনো জবাব মিলেনি।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ যুগান্তরকে বলেন, দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে কাউকে কাজ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। যদি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, সে বিষয়ে তিনি খোঁজখবর করে দেখবেন বলে জানান। প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি করে দেবেন। সত্যতা মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, কারিগরি বিষয়গুলো প্রধানত প্রকৌশলীদের দায়িত্ব। তারা কারিগরি বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে প্রশাসকের কাছে উপস্থাপন করেন। প্রশাসক সেসব স্বাক্ষর করেন। কারিগরি বিষয়গুলো প্রশাসকের পক্ষে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়।