Image description

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ইতোমধ্যে দলটির অন্তত ১৮ শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া জেলা-উপজেলা, বিভাগীয় শহরগুলোতেও দল থেকে পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এমন অবস্থায় গত ৪ জানুয়ারি দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দল থেকে পদত্যাগ করা নেতাদের ফেরাতে আলোচনা চলছে। এর আগে ২৮ ডিসেম্বর তিনি বলেছিলেন, ‘কয়েকজনের পদত্যাগে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ এমন বক্তব্যে দলের ভেতর-বাইরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে এনসিপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ দলটির অনেক কিছু করার আছে। যারা পদত্যাগ করছেন, করবেন-তারাও কি চূড়ান্তভাবে ভেবেচিন্তে পদত্যাগ করছেন? তাছাড়া দলে থাকা শীর্ষ নেতারাই বা কেন পদত্যাগ ফেরাতে পারছেন না-প্রশ্ন রাখেন এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

এদিকে দলীয় নেতৃত্বের অনুরোধে ইস্তফা কিংবা পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নিয়ে স্বপদে ফিরবেন কি না তারা, সেটাও অনিশ্চিত। ইতোমধ্যে দল থেকে পদত্যাগ করা বেশ কয়েকজন বলেছেন, ‘দলে আর ফেরা নয়, দলটি আদর্শ হারাতে বসেছে। আরও অনেকেই পদত্যাগ করবে, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে।’ এদিকে বুধবারও দলটির চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়ক মীর আরশাদুল হক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে ৫ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে এনসিপির ১৯ জন পদধারী নেতা দলের সব ধরনের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বুধবার বিকালে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, যারা ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, তাদের দলে ফেরানোর বিষয়টি এখনো ‘অন-প্রসেস’ (প্রক্রিয়াধীন)। বলার মতো অগ্রগতি এখনো নেই। তবে দলের পক্ষ থেকে আমাদের আগ্রহের জায়গাটুকু উপস্থাপন করছি। একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানও বলে যাচ্ছি। ওনাদের (পদত্যাগকারীরা) জায়গা থেকে ওনারাও বলছেন। মূলত এখনো ওই ধরনের আলোচনা হয়নি। বলা যায়, এখনো ফরমাল কোনো আলোচনা হয়নি। ইনফরমালি হয়তো কারও কারও সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।

এদিকে সম্প্রতি এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী এক শীর্ষ নেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘যে রাজনৈতিক দলে আমরা সম্পৃক্ত ছিলাম, ওই রাজনৈতিক দলটি এখন আমাদের নয়। নেত্রীদের অধিকাংশই পদত্যাগ কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। দলে থাকা শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আমাদের কোনো কথাই হয়নি। তারা আমাদের কী করে দলে ফেরাবেন, কথাবার্তাই নেই। দলের আখতার ভাই (সদস্য সচিব আখতার হোসেন) নিজেই বুক ফুলিয়ে বলেছেন, যারা পদত্যাগ করছেন, তাদের জন্য দলের কিছু আসে যায় না। এমন পদত্যাগে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না। আবার আখতার ভাই-ই বলছেন, পদত্যাগকারীদের দলে ফেরাতে আলোচনা চলছে। তিনি কার সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা করছেন, প্রকাশ করতে বলুন।’

এর আগে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ডা. তাজনূভা জাবীন। বুধবার বিকালে তার সঙ্গে যুগান্তরের পক্ষ থেকে কথা বলতে চাইলে তিনি জানান, তিনি একটি জুম মিটিংয়ে আছেন। তাই এখন কথা বলতে পারবেন না। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা এই নেত্রী তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি টেলিভিশন টক শোর ভিডিও শেয়ার দিয়ে ক্যাপশনে লেখেন, ‘পদত্যাগের পর থেকে আমাকে সবাই সাবধান করছে বিএনপি-জামায়াত কারও সমালোচনা না করতে, চুপচাপ থাকতে, বেশি বিপ্লবী না হতে। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আমারে কেউ থামাতে পারবে বলে মনে হয় না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদত্যাগকারী আরেক শীর্ষ নেত্রী বলেন, দলের কোনো শীর্ষ নেতা ফোন করেনি। ওরা নিজেরাই নিজেদের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। বলার জন্য বলা হয়েছে-পদত্যাগকারীদের দলে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া ওরা বললেই কী পদত্যাগকারীরা দলে ফিরবে, কখনো না। কারণ যারা পদত্যাগ করেছে-করছে ওরাও শীর্ষ নেতার পর্যায়ে পড়ে। সবকিছু জেনেবুঝেই পদত্যাগ করেছে এবং করা হচ্ছে। এনসিপি একক নির্বাচন করলে, নিশ্চিত অনেক ভালো করত-যোগ করেন এই নেত্রী।

এনসিপি থেকে ঢাকা-২০ আসনে নির্বাচন করছেন ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ। বুধবার বিকালে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছি। এনসিপি থেকে এই আসন এক প্রকার চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমি নারী হয়ে এ আসনে নির্বাচন করছি।’ অনেক নেত্রী পদত্যাগ করেছেন, পদত্যাগকারীদের দলে ফেরানোরও চেষ্টা চলছে-এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দল থেকে শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ সত্যিই দুঃখজনক। কেন পদত্যাগ করছেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে আমি দল থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাচ্ছি। আমার নেতা নাহিদ ভাইসহ সবাই আন্তরিক। দলের নেতারা কীভাবে পদত্যাগকারীদের দলে ফেরাবে, এ বিষয়টিও আমার জানা নেই।

এদিকে পদত্যাগকারীদের মধ্যে ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর বিরুদ্ধে তিনি আপিলও করেছেন। ডা. তাসনিম জারা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহও দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি মোর্চায় এনসিপির যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। এর আগের দিন সন্ধ্যায় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হওয়ার অনুরোধ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দেন ৩০ নেতা। একই দিন সন্ধ্যায় এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা।

এদিকে পদত্যাগের বাইরেও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ঘটনায় এনসিপির অন্তত পাঁচ নেত্রী বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে গণামাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে আসছেন। তাদের মধ্যে দুজন এনসিপি মনোনীত প্রার্থী হয়েও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারা হলেন মনিরা শারমিন ও মনজিলা ঝুমা। আরও অন্তত ৩ শীর্ষ নেত্রী দলে থেকেও নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন।

দলের মিডিয়া সেল সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে যারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে দল ছেড়েছেন, তাদের কারও পদত্যাগপত্রই এখনো গ্রহণ করা হয়নি। সেজন্য পদত্যাগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।