পাচার হওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারে তদন্তের জাল ফেলা হয়েছে দেশ ও বিদেশে। এর মধ্যে বিশ্বের ১৭৪টি দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (এফআইইউ) কাছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের খোঁজে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ যাবতকালে এতগুলো এফআইইউর কাছে সহায়তা চাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে আছে প্রায় ১৩শ মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা। তদন্তের জন্য এসব তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে আসা আরও ২শ ঘটনার অধিক তদন্ত চলছে। ঘটনার সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খবর বিএফআইইউ সূত্রের।
সূত্রমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে লেনদেনের তথ্য পাঠানোর ভিত্তিতে বিএফআইইউ এ তদন্তের জাল বিস্তার করেছে। তবে ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের ৬ মাস অতিক্রম হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তের জাল এই ছয় মাসে আরও বিস্তার লাভ করেছে।
জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, বিএফআইইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এফআইইউর কাছে তথ্য চেয়েছে। সেটি আইনগতভাবে চাইতে পারে। এর প্রেক্ষিতে যদি কোনো দেশের কাছে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের সন্ধান থাকে সে তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশ শেয়ার করবে। কোনো দেশ তথ্য থাকলেও মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠাতে বলবে। তবে সব দেশ নয়, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ এটি চায়। কোনো দেশ বলবে-আমার ডাটাবেজে এ তথ্য নেই তুমি যা চাচ্ছ। এছাড়া কী কারণে এ ধরনের তথ্য চাওয়া হচ্ছে এর ব্যাখ্যাও চাওয়া হতে পারে। অর্থ পাচারের তথ্য পেতে পরবর্তীতে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে সরকারকে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে পাচার হয়েছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পদ আছে, যার মূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে মনোনীত হয়েছেন। ২০২৩ সালে ইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ কোটি ডলার পাচার হয়।
এ তথ্য প্রকাশের পর পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং নতুন করে পাচার প্রতিরোধে সংস্থাগুলো বেশ সক্রিয় হয়ে উঠে। ব্যাংকিং চ্যানেলে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে নগদ অস্বাভাবিক লেনদেন (সিটিআর) ও সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর) কঠোর নজরদারিতে আনা হয়। বিভিন্ন ব্যাংকে এ ধরনের লেনদেন গভীরভাবে বিশ্লেষণ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)।
সূত্রমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থ পাচার, সন্দেহজনক লেনদেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাচারের ঘটনায় তদন্তের জন্য তথ্য প্রদানসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন তৈরি করতে ব্যাংক খাতের ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার নগদ লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হয় ২০ হাজার ৫২০টি। সেখান থেকে প্রায় ১৩শটি ঘটনা তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। অধিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০০টি ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনায় এ সময় বিএফআইইউতে অভিযোগ জমা পড়েছে ৪৪৮টি।
এর আগে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ব্যাংক খাতে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৬ হাজার ২২২টি সিটিআর লেনদেন শনাক্ত করা হয়। এর মধ্য থেকে বিশ্লেষণ করে ১০ হাজার ৮১৬টি সন্দেহজনক (এসটিআর) লেনদেন চিহ্নিত করা হয়েছিল। সন্দেহজনক গ্রাহকের হিসাবগুলোর মধ্যে ১৭৬টি ঘটনাকে অধিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) হচ্ছে ‘যা স্বাভাবিক এবং সাধারণ লেনদেনের ধরন থেকে ভিন্ন বা যে লেনদেন অপরাধ হতে অর্জিত সম্পদ বা কোনো সন্ত্রাসী কার্যে, কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে বা সন্ত্রাসীকে অর্থায়ন করে।’ আর সিটিআর লেনদেন হচ্ছে-ব্যাংকিং নিয়মে একজন গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট দিনে তার অ্যাকাউন্টে একাধিক বা একটি লেনদেনের মাধ্যমে দশ লাখ টাকা বা তারও বেশি জমা বা উত্তোলন করা।
অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংক খাত থেকে প্রাপ্ত সন্দেহজনক লেনদেন (এসটিআর) তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান, পুত্রবধূ শাজরেহ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক এমপি মির্জা আজম, জান্নাত আরা হেনরী ও ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল এবং সিটিজেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান তৌফিকা আফতাব। এছাড়া সন্দেহজনক লেনদেনের ভিত্তিতে আরও যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের কর্ণধার ওবায়দুল করিম, তার পরিবারের সদস্য, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও তার স্ত্রী শিরিন আক্তার, সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও তার স্ত্রী নাফিসা বানু, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিন ও তার স্ত্রী আফসারী খানম।
সূত্রমতে, অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা নিয়ে সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে অগ্রাধিকার কেসগুলোর দ্রুত সম্ভব চার্জশিট দাখিল, সংশ্লিষ্ট দেশে এমএলএআর প্রেরণ এবং মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে দেশে ও দেশের বাইরে ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ফ্রিজ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা এবং বিদেশে অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। এছাড়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের লক্ষ্যে অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত ১১টি কেসের জন্য গঠিত যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য ২১টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে ১০৪টি মামলা দায়ের ও ১৪টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া আদালত ৪টি মামলার রায় দিয়েছেন এমন তথ্য তুলে ধরা হয়।
অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইনের কিছু ধারা সংশোধনের কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।