সীমান্তজুড়ে থামছে না পণ্য পাচারের উভয়মুখী স্রোত। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদক, অস্ত্রসহ নানা ধরনের পণ্য দেদার ঢুকছে দেশে। উল্টো স্রোতে বাংলাদেশ থেকেও পাচার হচ্ছে সার, সিমেন্ট, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য। নার্কো কারেন্সি কিংবা বিনিময় প্রথার এই বাণিজ্য এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। চালান থামাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে বিভিন্ন পণ্য জব্দের তালিকা বড় হলেও তৎপরতা থামছে না চোরাকারবারিদের। প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতের আঁধারে ২৪ ঘণ্টাই চলছে চোরাচালানের আদানপ্রদান। সীমান্তবর্তী বাজারগুলো অবৈধ প্রসাধনী, শিশুখাদ্য, চকলেট, পানীয়, চোরাই মোবাইল ফোন, মসলা ও কাপড়ে ছেয়ে গেছে।
আবার বিভিন্নভাবে এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে বিভাগীয় ও জেলা শহরে। দেশের যেকোনো জায়গায় যেন হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ বিদেশি পণ্য।
শুধু তাই নয়- সীমান্তের কাঁটাতার টপকিয়ে গরু ছাগলসহ বিভিন্ন পশু আনা হচ্ছে দুই দেশের প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁটাতারের অভাবে বিভিন্ন স্পটে অরক্ষিত সীমান্ত, পাহাড়ি দুর্গম পথ, নজরদারির ঘাটতি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্রের কারণে থামানো যাচ্ছে না চোরাচালান। এতে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্রের অবাধ প্রবেশে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকিও। সেই সঙ্গে দেশ থেকে সরকারের ভর্তুকির সারসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য পাচার হচ্ছে। এজন্য দেশে এসব পণ্যের সংকট তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা চোরাচালানের অন্যতম হাব হয়ে উঠেছে। এ ছাড়াও যশোর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার সীমান্ত রুট দিয়ে চলছে চোরাচালান কার্যক্রম।
এক হাতে অস্ত্র-মাদক, অন্যহাতে পণ্য : প্রাপ্ত তথ্য মতে, মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেল, সিমেন্ট, সার, রসুন, পিয়াজ, ডাল, আলু, ভোজ্য তেল, আদা, কাপড়ও ওষুধসহ নিত্যপণ্য। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাচার হওয়া ইউরিয়া সারের উপাদান আরকান আর্মি বোমা তৈরিতে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সীমান্তে আরকান আর্মি বাঙ্কার নির্মাণ করায় সিমেন্টের চাহিদা বেড়েছে বলে জানা গেছে। পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে মাছ ধরার ট্রলার ও সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করছেন চোরাকারবারিরা। এই পাচারের কাজে অর্থের পরিবর্তে ‘পণ্য বিনিময়’ হয়ে থাকে। পাচার হওয়া জিনিসপত্রের বিনিময়ে আনা হচ্ছে মাদক ও অস্ত্র। সম্প্রতি উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিন অনুসন্ধানে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফের অন্তত ২১ পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত চক্র। প্রথম স্তরে রয়েছে কয়েকজন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সদস্য। যারা রাখাইন রাজ্য থেকে চাহিদা বা অর্ডার সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় স্তরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, যার মধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে ৬-৭ জনের একটি ব্যবসায়ী চক্র, যারা পণ্য সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহ পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। উখিয়ার গয়ালমারা এলাকার সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তি সার পাচার চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে।
একাধিক মামলা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুরউদ্দীন চৌধুরী বলেন, রাখাইন জনগোষ্ঠী ও আরাকান আর্মি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই এখন চোরাপথে আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে। মিয়ানমারে ইউরিয়া সার দিয়ে বোমা তৈরির কথা তিনি শুনেছেন। এমনকি ব্যাটারিতে ব্যবহৃত অ্যাসিডও পাচার হয়, যা ধরাও পড়েছে। বিজিবি কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানান, সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
সিলেট সীমান্তে শতাধিক করিডর : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় এবং জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও কানাইঘাট দিয়ে আসাম রাজ্য থেকে চোরাইপণ্য আসে। এই ছয় উপজেলার শতাধিক পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান হয়ে থাকে। মেঘালয়ঘেঁষা সীমান্তে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে আর আসাম সীমান্তে নদীপথে এই করিডর তৈরি করেছে চোরাকারবারিরা। এর মধ্যে মেঘালয়ঘেঁষা সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন জাতের মদ, ফেনসিডিল এবং আসামের সীমান্ত দিয়ে আসে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের চালান।
এসব করিডর দিয়ে ভারতীয় মসলা, পোশাক, চিনি, চা পাতা, চকলেট, বিস্কুট, এনার্জি ড্রিংকস, সাবান, টুথপেস্ট, শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা এবং গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আসছে। এই চোরাচালান কারবারে, পৃষ্ঠপোষক, মালামাল সীমান্ত পার করা চক্র, পরিবহন শ্রমিক, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ গ্রুপ এবং আড়তদার হিসেবে পৃথক সিন্ডিকেটে বিস্তৃত। এসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সিলেট সীমান্ত হয়ে উঠছে ভারতীয় পণ্যের হাট। বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য জব্দে কঠোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ পণ্য ও মাদক প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজশাহীতে ফেনসিডিলের অর্ধশত রুট : রাজশাহীর অর্ধশত রুটে সক্রিয় চোরাচালান চক্র। এসব রুটে একের পর এক ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক ও ভারতীয় পণ্যের চালান জব্দ হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পালিয়ে যাচ্ছে বাহকরা। ফলে চোরাচালানের মূল হোতারা থাকছে আড়ালে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোদাগাড়ী, চারঘাট, বাঘা ও কাটাখালী-দামকুড়া সীমান্তবর্তী এলাকা সবচেয়ে বেশি চালান আসছে। সম্প্রতি মাদক বড়ি ট্যাপেন্টাডল, বিভিন্ন ভারতীয় সিরাপ ও মদের চালান আসা বেড়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় ইলেকট্রিক পণ্য, কারেন্ট জাল, বিড়িসহ বিভিন্ন পণ্য আসছে। রাজশাহী বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ার ফিরোজ জানান, পদ্মা নদী ও চরাঞ্চলসহ বিস্তৃত সীমান্ত এলাকায় নজরদারি চালানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুষ্টিয়া সীমান্তে রমরমা বিকিকিনি : কুষ্টিয়ার চিলমারী বাংলাবাজার সীমান্ত এবং উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের একটি অংশ ভারতের অভ্যন্তরে চলে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। এ ছাড়া আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর ও বিলগাতুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চল্লিশপাড়া ও ভাগযোতসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, সীমান্তে মাদক প্রতিরোধে বিজিবি টহল ও জনবল বাড়ানো হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর দিয়ে ঢুকছে সবই : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন মাদকসহ ভারতীয় সব ধরনের পণ্যই আসছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে সোনা ও ডলার। চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা, নাস্তিপুর, বারাদি, কামারপাড়া, ফুলবাড়ি, সুলতানপুর, ঠাকুরপুর, দর্শনা, জীবননগরের সিংনগর, রাজাপুর, মাধবখালী, বেণীপুর, মেদেনীপুর ও সদরের আকন্দবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় মালামাল পাচার করে আনা হয়। নানান হাত বদলের পর এসব মালামাল গণপরিবহনের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। আর মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজীপুরের শেওড়াতলা মাঠ, তেঁতুলবাড়িয়ার হাটপাড়া ও রামকৃষ্ণপুর, সদরের বুড়িপোতা, কুতুবপুর, কাতুলী, আনন্দবাস ও দড়িয়াপুর এবং মুজিবনগরের আনন্দবাস, সোনাপুর, জয়পুর ও তারানগর সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে।
চোরাচালান চক্রের অন্যতম হোতাদের মধ্যে রয়েছেন- খুশি খাতুন, নাজমা, মসুদ, রাজিব হোসেন, আবুল হোসেন ও তার ছেলে ফিরোজ হোসেন। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং মানুষকে সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। এ রিপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন- কক্সবাজার প্রতিনিধি হাসানুর রশীদ, সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক শাহ্ দিদার আলম নবেল ও রাজশাহীর কাজী শাহেদ, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি আল-মামুন সাগর, মেহেরপুর প্রতিনিধি মাহবুবুল হক পোলেন, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জামান আখতার ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি সৈয়দ বয়তুল আলী।