Image description

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এক নাম। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে কুষ্টিয়া অঞ্চলে গড়ে তুলেছিলেন একচ্ছত্র আধিপত্য। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর উন্মোচিত হতে থাকে তার দুর্নীতির পাহাড়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভিন্নমতের ওপর চলা নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার ত্রাসের রাজত্ব ও  আমলনামা। জুলাই গণ-হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হানিফকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। তার ওপরে ৩২ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে হানিফ ও তার পরিবার আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী ঢাকা ও কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়েন তিনি। দুদকের অনুসন্ধানে হানিফ ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে দুজনের ব্যাংক হিসাব ও আয়কর নথি আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, শুধু হানিফ নিজে নন, তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও বৈধ আয়ের বাইরে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ঠিকাদারি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কমিশন বাণিজ্য একপ্রকার কুক্ষিগত করে রেখেছিল তার সিন্ডিকেট। 

কুষ্টিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব ও বিরোধী দমনে একনায়ক সুলভ আচরণে স্থানীয় রাজনীতিতে হানিফ ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। কুষ্টিয়া জেলাকে তিনি কার্যত নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ‘রাজনৈতিক রাজত্বে’ পরিণত করেছিলেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল-বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ভিন্নমতের যে কেউ তার সামান্য সমালোচনা করলেই নেমে আসত খড়্গ।  অভিযোগ রয়েছে, হামলা, মামলা এবং পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে কুষ্টিয়ার বিরোধী মতের রাজনীতিকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপের পেছনেও তার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল।

যেভাবে হানিফের উত্থান : কেন্দ্রীয় রাজনীতি তো দুরের কথা, একসময় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদেও নাম ছিল না মাহবুব-উল আলম হানিফের। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে তার পদ ছিল সহসভাপতি। ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান হানিফ। কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অর্থ সংকটের কারণে সেই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০০৮ সালে মহাজোট গঠনের পর হানিফ দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হন। মনোনয়ন না পেলেও দল ক্ষমতায় এলে হানিফকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন হানিফ। জেলায় গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকলেও শেখ হাসিনার সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাধে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষস্থানীয় পদ বাগিয়ে নিয়ে রাতারাতি লাইম লাইটে চলে আসেন বিতর্কিত এ নেতা। এরপর হানিফকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

কুষ্টিয়ার বালুমহল, হাট-ঘাট, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে চাঁদাবাজি, হাসপাতালে খাবার সরবরাহ, মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য। গত দেড় যুগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদকে পুঁজি করে তৈরি করেন অর্থসম্পদ অর্জনের নেটওয়ার্ক। দলীয় পদ ছাড়াও শেখ পরিবারের নিকটাত্মীয় হওয়ার সুবাধে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বাগিয়ে নেন বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডার ও ব্যবসা-বাণিজ্য। আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে হানিফ হয়ে ওঠেন দল ও সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ক্ষমতার দাপটকে কাজে লাগিয়ে দেশে এবং বিদেশে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। এ ছাড়াও কুষ্টিয়া বাইপাস সড়ক, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, গড়াই নদী খনন প্রকল্প, হরিপুর সেতু, সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সব সরকারি দপ্তরের বড় বড় প্রকল্প থেকে তিনি নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা। এসব দপ্তরের সব বড় কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন হানিফ। এ ছাড়াও হাসপাতাল, সিভিল সার্জন অফিস, কারাগারসহ সব প্রতিষ্ঠানের কাজ করতেন তার চাচাতো ভাই সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। প্রতিটি প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন যেত তার কাছে।

অফিস ভাড়া দিতে না পারা হানিফ গড়েন সম্পদের পাহাড় : একসময় অর্থ সংকটে দিশাহারা হানিফ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার নয়াপল্টনে অবস্থিত সিটি হার্টের অফিস ভাড়া পর্যন্ত দিতে পারতেন না। তবে দলের টানা ক্ষমতার সময়ে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার গুলশান, বনানী, কুষ্টিয়া ছাড়াও অন্তত চারটি জেলায় তার আছে বাড়ি-ফ্ল্যাট। এ ছাড়াও খুুলনায় মাছের ঘেরের সঙ্গে আছে রিসোর্ট। জমি আছে পাবনার ঈশ্বরদী, কক্সবাজারের টেকনাফে। গাজীপুরে নির্মাণ করেছেন একাধিক রিসোর্ট। দেশের বাইরেও কানাডাসহ কয়েকটি দেশে তার সম্পদ ও ব্যবসা আছে।

হানিফের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম কোয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল। কারওয়ান বাজারে বিএমটিসি ভবনে তার ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক অফিস। মূলত হানিফের নেশা ছিল রাজনীতির আড়ালে সম্পদ অর্জন।

সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কাছে দুবার নৌকা প্রতীক বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছিলেন কয়েক কোটি টাকা। কুষ্টিয়া শহরের বহুতল বিপণিবিতান পরিমল টাওয়ারে কোটি টাকা দামের দুটি দোকান আছে তার। সমবায় মার্কেটের নিচ ও দোতলায় একাধিক দোকান আছে। শহরের হাউজিংয়ে হানিফ পরিবারের ৫ কাঠার প্লটের ওপর ১০ তলা বাড়ি নির্মাণ করা হয় কয়েক বছর আগে। পিটিআই রোডে ৪ কাঠা জমির ওপর তিন তলা বাড়ি নির্মাণ করেন হানিফ। খেলার মাঠের পাশে দোতলা নতুন মার্কেটে আটটি দোকান আছে তার। জেলা পরিষদের বটতৈল এলাকায় তার ১২টি দোকানের খোঁজ পাওয়া গেছে।

ব্যবসা-চালের বাজারেও ছিল অবাধ নিয়ন্ত্রণ : রাজনীতির বাইরে কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যও ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। এমনকি স্কুল কমিটির সভাপতি কে হবে সেটাও নির্ধারণ করে দিতেন হানিফ। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে তার চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার নেতৃত্বে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এ সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা লুটে নেয়। শুধু লুটপাট নয়-বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দল এবং নিজ দলের প্রতিপক্ষ নেতা-কর্মীদের প্রতি দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগও রয়েছে হানিফের বিরুদ্ধে।

জুলাই গণ অভ্যুত্থান ও মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় : মাহবুব-উল আলম হানিফের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় রচিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানকালে। আন্দোলন দমনে তার উসকানিমূলক বক্তব্য, কুষ্টিয়ায় সরাসরি বৈঠক করে ছাত্র-জনতার ওপর সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের নির্দেশ এবং নৃশংসতা চালানোর তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে। জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হানিফকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন।