শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ধরে রাখা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। কিন্তু এই সময় কেবল উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নয়, বরং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার বড় প্রস্তুতিপর্ব। ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না গেলে এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলো বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখতে বাড়তি সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে সরকার, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বাড়বে। উত্তরণ পিছিয়েছে, তবে যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি বাতিল হয়নি। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা-তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতিকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
রপ্তানিতে স্বস্তি, প্রতিযোগিতায় চাপ : বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক সুবিধা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ধরে রাখার সুযোগ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ৮৩৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাকের সম্মিলিত অবদান ছিল ৮০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি কাঠামো এখনো একটি প্রধান খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ কমে যেতে পারে। এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির হিসাব, নিশ্চিত ক্ষতির পূর্বাভাস নয়। তবে বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার মাত্রা এতে স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। নতুন জিএসপি কাঠামোয় বাংলাদেশ উত্তরণের পরও অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত ইভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) সুবিধা পাবে। এরপর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয় নয়। শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের মতো শর্ত পূরণ করতে হবে। ফলে শুধু কূটনৈতিক তৎপরতা নয়, শ্রমিকের অধিকার, কর্মপরিবেশ ও কারখানার কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ভিয়েতনাম বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার চাপ বাড়াতে পারে। প্রতিযোগী দেশগুলো অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মূল্য ও সরবরাহ সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কম উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি পণ্যের মান, দ্রুত সরবরাহ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতায় দুর্বলতা : এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাও বড় বাধা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৫১০ কোটি ডলার থেকে কমে ২৮০ কোটি ডলারে নেমেছে। এটি নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে বিনিয়োগের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ, ঋণের সুদ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমসের জটিলতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। এসব সমস্যা সমাধান না হলে শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
ব্যাংকিং ও রাজস্ব সংস্কার জরুরি : অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও মূলধন সংকট বেসরকারি বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন জরুরি। তবে রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এমনভাবে বাড়ানো যাবে না, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান : তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষ জনবল ও মান নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা পরিবর্তিত হলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। চামড়া খাতে পরিবেশগত মান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিপণ্যে আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করতে হবে। কর্মসংস্থানও বড় উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১৯ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যার প্রভাব নারীদের ওপর বেশি পড়েছে। তাই নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থায়নে প্রস্তুতি : এলডিসি-পরবর্তী বাজারসুবিধা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি হলেও সেগুলো এখনো কার্যকর হয়নি। ভুটানের সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষরিত হয়েছে। আরও প্রায় এক ডজন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে দীর্ঘ আলোচনা ও কারিগরি প্রস্তুতি প্রয়োজন। ফলে প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা নিশ্চিত করতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদিকে উত্তরণের পর এলডিসি-নির্দিষ্ট কিছু সহজ শর্তের অর্থায়ন ও বিশেষ সুবিধা সংকুচিত হতে পারে। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন একসঙ্গে বন্ধ হবে না, তবে ঋণের শর্ত কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং বিদ্যমান অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তিন বছর কাজে লাগানোর পরীক্ষা : আগামী তিন বছরে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, প্রধান রপ্তানি বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন। পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস আধুনিকায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
এ জন্য জাতীয় স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ এবং প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে সংস্কার কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ এর আগেও করোনা মহামারির কারণে দুই বছর বাড়তি সময় পেয়েছিল। এর পরও বাণিজ্য চুক্তি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এবারও যদি সংস্কার পিছিয়ে যায়, তাহলে ২০২৯ সালে উত্তরণের আগে একই প্রস্তুতিহীনতার মুখোমুখি হতে পারে দেশ। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির স্বীকৃতি। কিন্তু উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন এবং উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এক বিষয় নয়। তিন বছরের বাড়তি সময় রপ্তানি খাতকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে কিন্তু এই স্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতায় রূপান্তর করতে না পারলে ঝুঁকি শুধু পিছিয়ে যাবে, দূর হবে না।
২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের নতুন সময়সীমা। কিন্তু সেদিন অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী থাকবে, তার ভিত্তি তৈরি করতে হবে এখনই। সময় পাওয়া গেছে; এখন বড় পরীক্ষা হলো সেই সময়কে সংস্কার, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে কতটা ব্যবহার করতে পারে বাংলাদেশ।