পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হান হত্যার ঘটনাটি সিলেট জুড়ে ক্ষোভের ঢেউ তুলেছিল। মূল টার্গেটে ছিল বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন। ঘটনার পরপরই ভারতে পালিয়ে যান তিনি। সীমান্তবর্তী এলাকাতেই বসবাস করতেন। ঘটনার এক মাসের মাথায় ২০২০ সালের ৯ই নভেম্বরে সেই আকবরকে কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও ছিল আলোচিত। সেই থেকে কারাগারে ছিলেন সিলেট মেট্রোপুলিশ থেকে বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবর হোসেন। আদালতে চলছিল বিচার। দ্রুত বিচারের জন্য বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম। গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান রায়হান হত্যার প্রধান আসামি আকবর হোসেন ভুঁইয়া। আদালতের কপি সিলেটে এনে তিনি তড়িঘড়ি করে কারাগার থেকে বেরিয়েও যান। বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় হয়। পরে তার জামিন স্থগিত হলে বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া আর আদালতে আসেননি।
বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, জামিন নিয়েই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন আকবর। তিনি ইউরোপের দেশ বেলারুশে অবস্থান করছেন। জামিনের পর দ্রুতই সব ব্যবস্থা করে পালিয়ে গেছেন তিনি। আসামি আকবর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগমও। পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন। দীর্ঘ ৬ বছর পর বৃহস্পতিবার বিকালে ঘোষণা করা হয়েছে সিলেটের আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার রায়। রায়ে প্রধান আসামি এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়ার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর আকবর পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম। তিনি বলেছেন- ‘দীর্ঘ ৬ বছর পর রায় ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু এই রায় শুনে আমি কী করবো। আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মেরেছে তারা তো পালিয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে এসে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম তিনজন আসামিই জামিন পায়? জামিন পেয়ে কীভাবে তারা পালিয়ে যায়? আজকে তো শুধু কাগজে কলমে রায় হয়েছে। আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে তো আমার ৬ বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেল।’ আইনজীবীরা জানিয়েছেন- গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান এসআই আকবর। এরপর ১১ই আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি।
১৩ই আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করে। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন। পাশাপাশি আকবর হোসেনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতে আর আত্মসমর্পণ করেননি আকবর। রায়হানের মা সালমা বেগম সেই সময়েই অভিযোগ করেন- আকবর হোসেন ভুঁইয়া জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরই ভারতে পালিয়ে গেছেন। ১২ই আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে এসআই আকবর আখাউড়া সীমান্ত হয়ে ভারত পালিয়ে যান। এ জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন। এদিকে আলোচিত এ হত্যা মামলার মোট ৬ আসামির মধ্যে একমাত্র বরখাস্ত হওয়া এএসআই আশেক এলাহী ছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত বাকি ৫ আসামিই পলাতক। কোম্পানীগঞ্জের সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান শুরু থেকেই পলাতক। ঘটনার পরপরই তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। মামলার রায়ে কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশীদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তারাও পলাতক। এ ছাড়া বরখাস্ত হওয়া এসআই হাসান উদ্দিন, আশেক এলাহী ও সাংবাদিক নোমানকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।