বন্ধ হয়ে গেল প্রায় তিন দশকের পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শপিংমল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। ১লা অক্টোবর থেকে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ের এই শপিংমলটি বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিক সমিতি।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ২০ তলা ভবনটির নিচের তিনতলায় বিপণিবিতান। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, উপহারসামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম ছিল সেখানে। চতুর্থ তলায় ফুড কোর্ট। শপিং কমপ্লেক্সটি চালুর সময় দোকানের সংখ্যা ছিল ১৯৮টি। পরে দোকান কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত মার্কেট বন্ধ হওয়ার দিন পর্যন্ত মার্কেটের ভেতরের দোকান খোলা ছিল মাত্র ১৭টি। বাইরে কিছু দোকানসহ ২৫টা দোকান খোলা ছিল।
সূত্র জানিয়েছে, সচল থাকা অবস্থায় কর্ণফুলী মার্কেটের দোকান মালিকদের ৮০ ভাগ কখনো ব্যবসা করেননি। ভাড়া দিয়ে দিয়ে চালিয়েছেন। যে ২০ ভাগ দোকান মালিক ব্যবসা করতেন, তারা চলে গেছেন ১৫ বছর আগে। তখন মার্কেট জমজমাট ছিল। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, যারা ভেজাল ব্যবসা শুরু করে। ফলে ক্রেতা হারাতে থাকে মার্কেটটি।
মঙ্গলবার সরজমিন মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের মূল ফটক বন্ধ। তবে মূল ফটকের বাইরে রেমন্ডের দোকানসহ কাচ্চি ডাইন, হটকেক, মেজবান ডাইনসহ কিছু খাবারের দোকান খোলা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর হয়তো ওইসব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
মার্কেটের রেমন্ড শপের দায়িত্বে থাকা মো. নাইম মানবজমিনকে বলেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে না পারলে টিকে থাকা মুশকিল। এই মার্কেটে সব বড়লোক আসতো। মার্কেট হুট করেই বন্ধ হয়নি। দীর্ঘদিনের ডাউনফল হতে হতে এটা আজকের পরিস্থিতি।
এদিকে, দোকান মালিক সমিতি জানিয়েছে, মার্কেট বিগত এক দশক ধরেই বন্ধ হওয়ার পথে ছিল। একদম শেষ প্রান্তে এলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। মার্কেটি ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করলেও ব্যবসায়ীরা প্রথম ধাক্কা খায়- শান্তিনগর মগবাজারের ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হওয়ার সময়েই। তখনই রাস্তাঘাট বন্ধ ছিল, ব্যাপক যানজট, ধুলাবালিতে ঢাকা ছিল ওই এলাকা। ফলে অনেক খ্যাতিমান দোকানি ও মালিক অন্য মার্কেটে চলে যান। তখন তাদের চিন্তা ছিল পরিবেশ পরিবর্তন হলে তারা মার্কেটে ফিরে আসবে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর লেগে যায় ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হতে। ফলে দোকানিরা অন্য মার্কেটে গিয়ে সেট হয়ে যান। তখনই অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যায়।
মালিক সমিতি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এই মার্কেটটি বিক্রি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। মালিকরা কয়েকটা কোম্পানি যেমন- হাসপাতাল, করপোরেট কোম্পানি, ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে চান। মালিক সমিতি বলছে, তাদের মূল লক্ষ্য দোকান মালিকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। তবে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, এই ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা হাসপাতাল স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এই মার্কেটের দর ২৫০ কোটি টাকার একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরে নেয়া হয়েছে। অগ্রাধিকার বিবেচনায় ইবনে সিনা ও অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতাল রয়েছে।
মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ বাকীবিল্লাহ ওসমানী মানবজমিনকে বলেন, মার্কেট বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটা দশক ধরেই চলে আসছে। শান্তিনগর মগবাজারের ফ্লাইওভারের কাজ হওয়ার সময় অনেক ব্যবসায়ী চলে যান। এরপর কোভিড চলে এলো; যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে গেছে আমাদের। একাধারে মিনিমাম প্রায় ১০০ দোকান একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হন। ভালো ভালো ব্যবসায়ী যারা, তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছু মালিক মারা গেলেন, তাদের ওয়ারিশরা দোকান চালাতে না পেরে ভাড়া দেন। কিছু দোকান একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি জানান, মার্কেটে ক্রেতার সমাগম কমতে কমতে এমন পর্যায়ে চলে গেছে আর মার্কেটকে সচল করানো যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সার্ভিস চার্জ পাচ্ছিলাম না। প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা প্লাস মার্কেটে খরচ ছিল আমাদের। বিগত ছয় থেকে আট মাস কমিটি এবং কিছু দোকান মালিক তাদের থেকে ঋণ নিয়ে মার্কেটের এই ব্যয় ভারটা বহন করছিল। তারপর বিগত প্রায় তিন-চার বছর ধরে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল- দোকান ভাড়া দেয়া যায় কি না। এখন বিক্রি প্রক্রিয়া আগানোর পাশাপাশি আমরা চেষ্টা করছি মার্কেটটাকে খোলা রাখার, কিন্তু ব্যয়ভার মিটানো যাচ্ছিল না, তাই আসলে শেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মার্কেটটা বন্ধ করা।
লোকসান গুনেই মার্কেট ছাড়লেন ব্যবসায়ীরা: কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে পুরাতন অনেক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে একই জায়গায় ব্যবসা করে আসছিলেন। মার্কেট বন্ধ হওয়াতে বিপাকে পড়েন তারা। জানিয়েছেন, আসবাবপত্রসহ মূল ভাড়ার বাইরেও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ কয়েক লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের পুরনো ক্রেতা হারিয়েছেন তারা। একই জায়গায় ব্যবসা করার ফলে ক্রেতারা কর্ণফুলী মার্কেটে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট দোকানের উপর নির্ভর ছিলেন। ফলে ওই নির্দিষ্ট ক্রেতা হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
বীরেন্দ্র মল্লিক নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কর্ণফুলীতে ছিলাম দীর্ঘদিন। এখন লোকসান নিয়েই বের হয়ে আসতে হয়েছে। এখানে আমাদের সেটিং করা ব্যবসা ছিল, ওইখানে ডেকোরেশন ছিল, ওইখানে ডেকোরেশন ভেঙে এগুলো ভাঙ্গাড়ি হিসেবে বিক্রি করতে হয়েছে। প্রায় অনেক টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে আছি।