জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়েহ-এর আমন্ত্রণে চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি দ্বীপরাষ্ট্রটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১২ টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ৩৭৬কে) বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তিনি জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। আজ সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে) প্রধানমন্ত্রী জাপানের রাজধানী টোকিও’র নারিতা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন। তাদের মধ্যে- অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি (বিডা) এর চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান বিষয়ক) ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিলসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মিডিয়া টিম এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফর কেবল চিরাচরিত প্রটোকলভিত্তিক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি রূপ নিতে যাচ্ছে দুই দেশের অর্ধশতাব্দীর মৈত্রীকে আধুনিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে।
১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, যমুনা বহুমুখী সেতু, ঢাকার মেট্রোরেল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্পর্কের চরিত্র ঋণনির্ভর সহায়তা বা আনুষ্ঠানিক অনুদান কাঠামো থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক বাণিজ্যিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খল অংশীদারত্বে মোড় নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী মূলত কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বার্তা নিয়ে জাপান যাচ্ছেন। তার এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মতো বহুমাত্রিক ইস্যু গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জাপানের টোকিওর চিবা অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল এবং পাওয়ার প্ল্যান্ট, ইউনিক্লো কোম্পানির হেডকোয়ার্টার এবং নাগোয়াতে গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টয়োটার কারখানা পরিদর্শন করবেন। এ সংক্রান্ত সফরসূচি প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
এছাড়াও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে নৈশভোজসহ বেশ কয়েকটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন তারেক রহমান। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ এবং জাপানের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদারকরণ সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে শান্তি ও স্থিতি, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। জাপান সফরে ব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী। তার জাপান সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারকের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশে আরও জাপানি বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচন হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগে গুরুত্ব : বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। জাপান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এ সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কানেক্টিভিটি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে “কৌশলগত অংশীদারত্ব” পর্যায়ে বিদ্যমান, যার আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামোগত স্থাপনা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আরো কার্যক্রমের পরিকল্পনা এ সফরে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান ‘কৌশলগত সহযোগিতা’র প্রেক্ষাপটে আসন্ন সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর ও সুদূরপ্রসারী করার একটি সময়োপযোগী সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ ইপিএ স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্প নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে, সফরকালে ইপিএ’র কার্যকর বাস্তবায়ন, বাংলাদেশি পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন সহ নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ও সফরে গুরুত্ব পাবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করবেন বলে প্রাথমিকভাবে সফরসূচি নির্ধারিত হয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করবেন। অন্যান্য সম্ভাব্য বৈঠকের ও কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল এন্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (জেবিসিসিইসি) এর চেয়ারম্যান, জাইকার প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এর গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এর সভাপতি, সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান-এর সাথে বৈঠক, জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য প্রদান, জাপানের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক প্রভৃতি।
এলএনজি টার্মিনাল ও টয়োটার কারখানা পরিদর্শন : সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসু সিটি, চিবা-তে এলএনজি টার্মিনাল এবং পাওয়ার প্ল্যান্ট, ইউনিক্লো কোম্পানির হেডকোয়ার্টার এবং নাগোয়াতে টয়োটার কারখানা পরিদর্শন করবেন বলে সফরসূচি প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে জাপানের কোম্পানির কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহায়তা পাবার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সূচি প্রস্তুত রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গ : পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাইরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে শান্তি ও স্থিতি, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট নিরসনে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে যৌথ ভূমিকা পালনের ব্যাপারে দুই পক্ষ ফলপ্রসূ আলোচনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আরও বলেন, এ সফরের ফলস্বরূপ আশা করা যায় যে, বাংলাদেশ এবং জাপানের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার, সম্পর্কের নতুন দ্বার উন্মোচন, জাপান থেকে বাংলাদেশে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ এবং চলমান প্রকল্পসমূহ ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব জোরদার, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এই সফরকে উপলক্ষ করে কৃষি, মৎস্য সম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারকের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাক্ষরিত হবে একাধিক সমঝোতা স্মারক : প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অর্জন ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোতে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে ৭-৮টি দলিল চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে আলোচনা শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি দলিল সই হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সফরকালে এসব সমঝোতা স্মারকের অনেকগুলোই সই হবে।’
প্রস্তাবিত এসব সমঝোতা চুক্তির মধ্যে রয়েছে- অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) যৌথ ফ্রেমওয়ার্ক; এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুরক্ষা, বিনিয়োগ সংরক্ষণ এবং এলডিসি-উত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা। দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ; নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচির অধীনে নার্সিং, আইটি ও নির্মাণ খাতে নিয়োগ সহজীকরণ। জ্বালানি নিরাপত্তা ও এলএনজি লজিস্টিকস; মাতারবাড়ী ও মহেশখালীতে জাপানি বিদ্যুৎ জায়ান্ট ‘জেরা’র এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও সরবরাহ চেইন জোরদার। অটোমোবাইল ও হাই-টেক বিনিয়োগ সুরক্ষা; বাংলাদেশে জাপানি গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সুরক্ষা। সমুদ্র নিরাপত্তা ও কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি; বঙ্গোপসাগরে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিতে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ও পেট্রোল ভেসেল হস্তান্তর। আইসিটি ও সেমিকন্ডাক্টর মানবসম্পদ উন্নয়ন; জাপানি তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে বাংলাদেশি প্রোগ্রামারদের কর্মসংস্থান ও ন্যানো-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ। কাস্টমস আধুনিকায়ন ও ওয়ান-স্টপ সেবা সমন্বয়; আড়াইহাজারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রশাসনিক লালফিতা হ্রাস ও লজিস্টিক অটোমেশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে যাচ্ছে ইপিএ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত বাজারে বাংলাদেশ যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) হারাবে, তার বিকল্প হিসেবে জাপানের সাথে একটি সমন্বিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। ইপিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতা ও কৃষিজাত পণ্য জাপানের বাজারে দীর্ঘমেয়াদে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। জাপানি হাই-টেক যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স ও শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা মিলবে, যা বাংলাদেশের উৎপাদন খাতকে বিশ্বমানে রূপান্তর করবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান ৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা পেরিয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে পৌঁছানোর ক্ষেত্র তৈরি হবে।
১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা: আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, জাপানের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বিপুল পরিমাণ দেশীয় অর্থ) বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রস্তুত করছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে স্থাপিত ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ (জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল)-এ বিশ্বের নামকরা জাপানি ব্র্যান্ডগুলো তাদের কারখানা স্থানান্তর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন জেইট্রো এবং কেইদানরেন -এর শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে সরাসরি বৈঠকে এই বিনিয়োগ দ্রুত ছাড় ও শিল্প স্থাপনের নিশ্চয়তা তুলে ধরছেন।
অটোমোবাইল ও ভারী শিল্পায়ন : টয়োটার বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের বাজার এতদিন ব্যবহৃত (রিকন্ডিশন্ড) জাপানি গাড়ির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল ছিল। তবে এই সফরে আলোচনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বখ্যাত অটো জায়ান্ট টয়োটা মোটর করপোরেশন-এর সরাসরি স্থানীয় বিনিয়োগের বিষয়টি। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, টায়ার, প্লাস্টিক ও ক্যাবল প্রস্তুতকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের এক অভাবনীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি হবে এবং হাজার হাজার দক্ষ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রবাসীদের মাঝে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর ঘিরে সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে ইতোমধ্যে একাধিক প্রস্তুতি ও ব্যবসায়িক মতবিনিময় সভা করেছেন।
জাপান বিএনপির সভাপতি ও ব্যবসায়ী রেজা মীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত খুশির ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরে দলমত নির্বিশেষে আমরা সবাই যাবো। ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সঙ্কট সমাধানে পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নেবেন।
জাপান বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী এমদাদুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই রাষ্ট্রীয় সফর বাংলাদেশ ও জাপানের বহুদিনের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরার বড় সুযোগ তৈরি হলো এই সফরের মাধ্যমে। সেইসঙ্গে জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং নতুন করে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই সফর অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমরা আশাবাদী, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে জাপানি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি তরুণদের অংশীদারত্ব আরও বাড়বে।
জাপান প্রবাসী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। কেননা, দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।