Image description

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সময়ের সঙ্গে সারা দেশে লাগামহীনভাবে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ২৪৯ জন, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ নিয়ে চলতি মাসে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৯ জন।

অতিরিক্ত রোগীর চাপে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যা না পেয়ে রোগীরা হাসপাতালের বিছানা ছাড়িয়ে মেঝে ও বারান্দায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সামান্য জ্বর নিয়েই মানুষ হাসপাতালে ছুটছেন, আর পরীক্ষা করাতে গিয়ে শনাক্ত হচ্ছে ডেঙ্গু। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার। গ্রামগঞ্জেও রোগটি ছড়িয়ে পড়ায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। ফলে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর হাসপাতালগুলোতে চাপ আরও বহুগুণ বেড়েছে।

ঢাকার সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিত্র ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ তিনটি প্রধান সরকারি হাসপাতালের কোথাও নতুন কোনো রোগীর জন্য তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেড না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা এবং সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় চাদর পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম (৫৫) তিন দিন ধরে তীব্র জ্বর ও গায়ে ব্যথা নিয়ে ঘুরছেন। মুগদা হাসপাতালে কোনো সিট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জরুরি বিভাগের সামনের ফ্লোরেই বিছানা পাততে হয়েছে। তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘তিনটা হাসপাতাল ঘুরে কোথাও সিট পেলাম না। অবস্থা খারাপ দেখে বাধ্য হয়ে এই ফ্লোরেই স্যালাইন লাগাতে হয়েছে। মশারি টাঙানোর জায়গাও নেই।’ শহীদুল ইসলামের পাশেই চিকিৎসা নিচ্ছেন মানিক নগরের বাসিন্দা সুরাইয়া খাতুন (৩৬)।

সুরাইয়ার মেয়ে সালমা খাতুন বলেন, তিনটি হাসপাতাল ঘুরে কোথায় সিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে মুগদা হাসপাতালের ফ্লোরেই ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করাচ্ছি। এ হাসপাতালের সিঁড়ির পাশে বিছানা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রাব্বী শেখ। তিনি বলেন, সরকারি কোনো হাসপাতালে সিটি পাইনি। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। বাধ্য হয়েই হাসপাতালের সিঁড়িতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছি। এ হাসপাতালের চিকিৎসক কনক সরোয়ার বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর প্রচুর চাপ। প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যেখানেই হোক হাসপাতালে ভর্তি হলে আমরা চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। ৬০ বছর বয়সি মুসা আহমেদ ডেঙ্গুজ্বরে ভুগছেন সাত দিন ধরে। 

তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইরে সিঁড়ির কাছে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে ঠাঁই হয়নি তার। ফলে বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি এসেছেন মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে। তার পাশে একইভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন কেরানীগঞ্জ থেকে আসা আরেক ডেঙ্গু রোগী আবদুস সাত্তার। বয়স ২১ বছর। এই ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, ওয়ার্ডটিতে ৪০টি সিট থাকলেও রোগী ভর্তি আছেন ৬০ জন। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। এতে চিকিৎসা দিতে গিয়ে তাদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। একই ভবনের ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডটিও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত।

মালিবাগের একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ভর্তি আছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার বাবা আবদুল কুদ্দুস জানান, গত শুক্রবার সুমাইয়ার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ওয়ার্ডে সিট না পেয়ে তাকে বারান্দার এক কোনায় রাখা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে তো গরিব মানুষই আসে। কিন্তু এখানে এসে যদি মেঝেতেই থাকতে হয়, তবে চিকিৎসা আর কোথায় পাব?’ জামালপুর থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে শিশু আল মামুন (৭)। মামুনের পিতা এখলাস মোল্লা জানান, ‘জামালপুর হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম, অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছি। কিন্তু সিট পাইনি। বাধ্য হয়ে ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অন্যান্য বছর নভেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমে আসে। কিন্তু এ বছর এটি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তাই এটিকে এখনই মশার বাসস্থান লক্ষ্য করে নির্মূলের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রজননস্থলকে টার্গেট করে যদি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে ফলাফল আসবে না। সিটি করপোরেশনগুলো মশক নিয়ন্ত্রণে অনেক কাজ করছে, কিন্তু ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও বাড়বে। তাই এখনই এডিস মশার প্রজননস্থল লক্ষ্য করে লার্ভিসাইডিং এবং ব্লিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্টের উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযান, সাময়িক তৎপরতা কিংবা দৃশ্যমান কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি। মশা কোথায় জন্মাচ্ছে, কোন পরিবেশে বেশি বংশবিস্তার করছে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কীভাবে নতুন মশার উৎপাদন বন্ধ করা যায়, এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশের হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত প্রায় ৫ হাজার রোগী ভর্তি থাকছে। গত বছর এ সময়ে ডেঙ্গুতে প্রায় ২ হাজার রোগী ভর্তি ছিল। বাড়তি এ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা হাসপাতালগুলোর রয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে নতুন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে, শয্যা বাড়ানো হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীর চাপ মূলত ঢাকা শহরে এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে।

এজন্য মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। টেস্টের চাপ কমাতে নতুন যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী বেশি, সেখানেও ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করে শয্যা বাড়িয়ে চিকিৎসা চলছে। ঢাকার বাইরে খুলনা, পিরোজপুরে বাড়তি রোগীর চিকিৎসায় শয্যা বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালে চাপ কিছুটা বেড়েছে, কোনো রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না।’ চট্টগ্রামে ডেঙ্গু চিকিৎসার ডিএনএস সংকট : সাধারণত ৫০০ মিলিলিটারের একটি ডেক্সট্রোজ নরমাল স্যালাইন (ডিএনএস) এর দাম ৭০-৮০ টাকা এবং ১ হাজার মিলিলিটারের ডিএনএসের দাম ৮০-৯০ টাকা। 

কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপকে পুঁজি করে বাজারে ডিএনএসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এটি এখন পাওয়ায় যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলে ৭০ টাকার ডিএনএস ২০০ টাকা এবং ৮০ টাকার ডিএনএস ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে হাজারী গলির এক ফার্মেসির মালিক বলেন, কোম্পানিগুলো কিছুদিন ধরে ডিএনএস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। সামান্য যা পাওয়া যায়, তা বেশি দামে কিনতে হয়। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু রোগীর জন্য ডিএনএস জরুরি নয়, নরমাল স্যালাইনও দেওয়া যায়। তবে বাজারে সংকটের বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।

আমি খবর নিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে গত শনিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ হাজার ৫৯৩ জন। চলতি মাসের গত ২৪ দিনে মোট আক্রান্ত হয় ২ হাজার ১২৭ জন। দৈনিক আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ৮৯ জন। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট মারা যান ৩৩ জন।