Image description

দিন দিন বেড়েই চলেছে চলন্ত ট্রেনে পাথর ও ঢিল নিক্ষেপের ঘটনা। এতে জানালার কাচ ভেঙে আহত হচ্ছেন যাত্রী ও রেলকর্মীরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেলের সম্পদ। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় মাপের শঙ্কা। বেপরোয়াভাবে ঘটতে থাকা এমন ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। সব মিলিয়ে ট্রেনযাত্রা এখন ভয়ংকর বিপদের মুখে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচল করা ট্রেনগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। পটিয়া থেকে কক্সবাজারের রামু রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী ট্রেনেও পাথর ছুড়ছে দুর্বৃত্তরা। কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের ২০ জেলার প্রায় ৭০টি স্থানকে পাথর নিক্ষেপের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিতও করেছে।

প্রতি মাসে গড়ে ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা : ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন কক্সবাজার রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। ২৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে আরও একটি আন্তনগর ট্রেন চলাচল শুরু করবে। কিন্তু রেলসেবা চালুর পর থেকেই কক্সবাজার রুটের ট্রেনগুলোতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়েছে।  রেল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচল করা ট্রেনগুলোতে গড়ে প্রতি মাসে ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে কক্সবাজারের রামু রেলস্টেশন পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছে।

এর আঘাতে যাত্রীরা গুরুতর আহত হচ্ছেন। কারও কারও দাঁতও ভেঙে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, এরপরও পাথর দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, রেললাইন নির্মাণের সময় যারা জমি হারিয়েছেন বা লাইনের খুব কাছাকাছি যারা বসবাস করেন-তাদের ক্ষোভ বা হতাশা থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া অনেক সময় স্রেফ আনন্দের বশবর্তী হয়েও এলাকার কিশোররা পাথর ছুড়ে থাকে। কুমিল্লায় বেড়েছে পাথর নিক্ষেপ : নোয়াখালীমুখী উপকূল এক্সপ্রেস। কুমিল্লা বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর স্টেশন অতিক্রমের সময় পাথর ছোড়া হয়। জানালার কাচ ভেঙে ভিতরে ঢোকে পাথর। সেই পাথরে মাথায় আঘাত পেয়ে যাত্রী মহিউদ্দিন আহত হন। 

তাকে নোয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আগস্ট মাসের প্রথম দিকের ঘটনা এটি। এভাবে শুধু উপকূল নয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ছে দুর্বৃত্তরা। এতে আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। জনবহুল এলাকায় এ ঘটনা বেশি ঘটছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা অঞ্চলে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। ট্রেন চলে ১৬ জোড়া। ছয় মাসে এ অঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের ৩৬টি ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম রুটে ঘটে ৩০টি। লাকসাম-নোয়াখালীতে ৪টি এবং লাকসাম-চাঁদপুর রুটে ঘটেছে ২টি ঘটনা। এতে আহত হন জানালার পাশের ব্যক্তিসহ অন্য যাত্রীরা। তবে আটক করা যায়নি কোনো অপরাধীকে।

পশ্চিমাঞ্চলে ৭০ স্পট চিহ্নিত : পশ্চিমাঞ্চলে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে এখন তীব্র আতঙ্ক। পাবনার ঢালারচর-রাজশাহী রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আগেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বরে ওই রেলপথের দুবলিয়া ও তাঁতিবন্ধ স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় এক মাসে ২০ বারের বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনায় ১০ জনের বেশি যাত্রী আহত হন এবং ট্রেনের ১৮টি জানালার কাচ ভেঙে যায়। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চল রেলে এক বছরে ৭৪টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ৭৪টি হামলার কারণে ৬৩টি ট্রেনের দরজা ও জানালার কাচ ভেঙে গেছে।

এসব ঘটনায় ২০ জন আহত হন, যার মধ্যে চালক, সহকারী চালক, গার্ড ও সহকারী এবং সাধারণ যাত্রী (শিশুসহ) ছিলেন। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ২০ জেলার প্রায় ৭০টি স্থান পাথর নিক্ষেপের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সূত্র জানায়, পশ্চিমাঞ্চলের ১৫টি পয়েন্টে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। পয়েন্টগুলো হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা, নাটোরের আবদুলপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশন, পাবনার মুলাডুলি, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার কিসমত-রুহিয়া, পাবনার ভাঙ্গুড়া, বগুড়ার ভেলুরপাড়া, গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা, জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর রেলস্টেশন এলাকা, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, সলপ রেলস্টেশন এলাকা, জামতৈল রেলস্টেশন এলাকা, পাবনার বড়ালব্রিজ রেলস্টেশন এলাকা ও খুলনার ফুলতলা স্টেশন এলাকা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম জানান, যেসব এলাকায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে, সেসব স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় তরুণরা বেশি জড়িত।

‘পাথরে’ অনিরাপদ ভ্রমণ :  একটি বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৩ জুন রাতে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলস্টেশন অতিক্রম করছিল। তখনই হঠাৎ জানালার পাশে বসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়ার বাসিন্দা আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাসের চোখে বাইরে থেকে এসে পড়ে একটি পাথর। জানালার কাচ ভেঙে পাথরটি তার ডান চোখে আঘাত করে। এরপর গুরুতর অবস্থায় প্রথমে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। করা হয় দীর্ঘ অস্ত্রোপচার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার চোখটি রক্ষা করা যায়নি। এ ছাড়া দুই মাস আগে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ চকরিয়া এলাকা পার হওয়ার সময় পাথর ছোড়ায় মোহাম্মদ হিমেল নামে এক যুবকের ঠোঁট কেটে গুরুতর জখম হয়। এতে তার চারটি দাঁত ভেঙে যায়। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের পুরো বছর এবং ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের প্রায় আড়াই শ ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের আশুগঞ্জ-কসবা অংশ মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় ৭২ কিলোমিটার রেলপথ এখন পূর্বাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত।

গাজীপুরে নিরাপত্তাঝুঁকিতে যাত্রীরা : গাজীপুরের টঙ্গী জংশন এলাকায় রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিত্যদিনের। টঙ্গী জংশনের চারপাশে নেই নিরাপত্তাবেষ্টনী, নেই জনবল। ফলে চরম নিরাপত্তাঝুঁকিতে চলাচল করছেন যাত্রীরা। অভিযোগ অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়ে চলেছে। থানা পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। জানা গেছে, গাজীপুরের টঙ্গী রেলওয়ে জংশন এলাকায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটছে। একের পর এক এমন ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। টঙ্গী স্টেশনের প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে বনমালা রেলগেট, তিস্তার গেট ও মরকুন উত্তরপাড়া নিমতলী আউটার সিগন্যালে ট্রেন থামার সময় বা গতি কমালেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা পাথর নিক্ষেপসহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে। তারা ট্রেনে থাকা যাত্রীদের মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

শ্রীমঙ্গলে আহত হচ্ছেন যাত্রীরা : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে আহত হচ্ছেন যাত্রী ও রেলের কর্মচারীরা। শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের আশপাশে অনেকগুলো কলোনি গড়ে উঠেছে। এসব কলোনি, আশপাশের বস্তি ও রেল ব্রিজ এলাকাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে দুর্বৃত্তরা। এদের অনেকেই মাদকাসক্ত। ট্রেন এলেই সুযোগ বুঝে তারা পাথর ছুড়ে মারে। এদিকে পাথর ছোড়া রোধে সচেতনতা বাড়াতে চলতি বছরের জুলাই মাসে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে বসুন্ধরা শুভসংঘ শ্রীমঙ্গল শাখার উদ্যোগে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক; কুমিল্লা, কক্সবাজার, টঙ্গী ও শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি।