পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোটি কোটি টাকা খরচে কেনা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এখন নির্বাচন কমিশনের গলার কাঁটা। কারচুপির সুযোগ থাকায় রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনেই এসব যন্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। ফলে জনগণের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। উল্টো এগুলো সংরক্ষণ করতে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে কোটি টাকা। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) গুদামে রাখা ইভিএমের ভাড়া বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি টাকায়। বিভিন্ন গোডাউনে মেশিন রাখায় দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইভিএম আর ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও যন্ত্রগুলো এখনো কমিশনের জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা হয়ে আছে। এগুলোর বর্তমান অবস্থা, অবস্থান ও সংখ্যা নির্ধারণে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিক্রি, পুনর্ব্যবহার কিংবা ধ্বংসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত, নিরীক্ষা ও মামলাসংশ্লিষ্ট আলামত সংরক্ষণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইভিএম এখন আমাদের কাছে বার্ডেন; এটার কোনো ব্যবহারও নেই এবং লাখো ইভিএম মেয়াদোত্তীর্ণও হয়ে গেছে। দ্রুত এর ডিসপোজাল করা হবে।’ তিনি জানান, ইভিএমের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান নির্ধারণে একটি কমিটি করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, আগামী কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। এসব যন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দু’টি কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গুদাম ভাড়াতেই ৭০ কোটি টাকা: নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কমিশনের কাছে রয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫৯৯টি মেশিন খোয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। বিএমটিএফের কাছে রাখা ইভিএমের গুদাম ভাড়া বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি টাকায়। এ ছাড়া, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন গোডাউনে রাখা যন্ত্রগুলোর জন্য প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা। বর্তমানে বিএমটিএফে রয়েছে- ৮৬ হাজার ২৩৩টি ইভিএম। আঞ্চলিক পর্যায়ে সিলেটে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহীতে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুরে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনায় ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লায় ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুরে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশালে ৫ হাজার ৮৭টি এবং ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম রয়েছে। এ ছাড়া, নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট ও দু’টি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ১৫৭টি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইভিএমের ভাড়া বাবদ বিএমটিএফ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করছে। এতে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ধরা হয়েছে ১৩৪ টাকা। বকেয়া টাকা দিতে ও ওয়্যারহাউজ খালি করতে সর্বশেষ গত বছরের ১৫ই ডিসেম্বর ইসিকে চিঠি দিয়েছে বিএমটিএফ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় বকেয়া টাকার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে এই টাকা পরিশোধ করতে পারছে না ইসি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। ফলে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
ইভিএমের চূড়ান্ত পরিণতি কী?: ইভিএমের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। সব মেশিন ধ্বংস করে ফেলাই নিষ্পত্তির একমাত্র পথ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যন্ত্রগুলোর কোনো অংশ অন্য কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, বিক্রি করে অর্থ পাওয়া সম্ভব কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। নির্বাচন কমিশনার মাছউদ বলেন, সরকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে ইভিএম নিষ্পত্তির পথ বের করতে হবে। অধিকাংশ মেশিন বিএমটিএফে রয়েছে, কিছু রয়েছে মাঠপর্যায়ে। এসব যন্ত্র সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভাড়া চাইছে। তিনি বলেন, এত ভাড়া দিতে গেলে তো বিরাট মুশকিল।
তাই আমরা চাচ্ছি- দ্রুত এটাকে যদি ডিসপোজাল করে দিতে পারি। তাহলে আমরা এ লায়াবিলিটি থেকে আপাতত বেঁচে যাই।’ ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, যন্ত্রগুলোর কোন অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য, কোনগুলো বিক্রি করা সম্ভব এবং কোনগুলো একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী- তা যাচাই করা হবে। যেসব যন্ত্র মেরামত কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের উপযোগী নয়, সেগুলো ধ্বংস করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে। অন্যদিকে, ইভিএম নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অব্যবহৃত ইভিএমের ক্ষেত্রে পরিবেশসম্মত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে এসব যন্ত্র পুড়িয়ে ফেললে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত ১২ই অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় ইভিএমের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগের কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইভিএমগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেয়া হবে।