সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগের বড় উদাহরণ পিরোজপুরে ভান্ডারিয়া উপজেলার সড়কগুলো। আর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী রাজনীতিকদের একটি গোষ্ঠী। এদের মধ্যে জেলার সাবেক দুই এমপি মহিউদ্দিন মহারাজ ও শ ম রেজাউল করিম রয়েছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলা কার্যালয় ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নেওয়া ১৭টি প্রকল্পের তদন্ত করে। এতে অন্তত আটটি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়। এই আট প্রকল্পের মোট চুক্তিমূল্য ছিল ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ছাড় করা হয়েছে ২ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে সম্পন্ন কাজের মূল্য মাত্র ৮২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ সম্পন্ন কাজের মূল্যের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।
এ আটটি প্রকল্পের সব কাজ পেয়েছিল একই পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ওই পরিবারের সদস্যরা হলেন পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক স্বতন্ত্র এমপি মহিউদ্দিন মহারাজ, তার তিন ভাই ও এক ভাইয়ের স্ত্রী। নথিপত্রে দেখা যায়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ, একই কাজের জন্য একাধিকবার অর্থ পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং নথিপত্র সংরক্ষণে গুরুতর অবহেলার ঘটনা ঘটেছে। কিছু সরকারি নথি পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রায় ২০০টি টেন্ডারে একজন করে দরদাতা অংশ নিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে যে দুটি প্রতিষ্ঠান দরদাতা হিসেবে অংশ নিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানের মালিক মহিউদ্দিন মহারাজ।
অর্থাৎ অন্য ঠিকাদারদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এমনভাবে সিস্টেম তৈরি করেছে যেন অংশ কেউই অংশ নিতে না পারেন। এলজিইডির হিসাব অনুযায়ী, আটটি প্রকল্পেই সম্পন্ন কাজের মূল্য অপেক্ষা বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বরিশাল ডিভিশন ইমপরট্যান্ট উপজেলা অ্যান্ড ইউনিয়ন রোড ওয়াইডেনিং অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ১৫ শতাংশ, আর অর্থ পরিশোধ ৯০ শতাংশ। ক্লাইমেট-অ্যাডাপটিভ ফার্মিং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রুরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৪১ শতাংশ, আর অর্থ পরিশোধ ৮৫ শতাংশ। ইমপরট্যান্ট ব্রিজ রি-কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশ, আর অর্থ পরিশোধ ১০৬ শতাংশ।
অর্থাৎ কাজ অর্ধেক শেষ হলেও চুক্তিমূল্যের চেয়েও বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে। আরবান হেলথ ব্রিজেস প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশ, অর্থ পরিশোধ ১০০ শতাংশ। আপগ্রেডিং টু মডার্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৬৫ শতাংশ, অর্থ পরিশোধ ৮৬ শতাংশ। ভিলেজ রোড রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৬৬ শতাংশ, অর্থ পরিশোধ ৭৭ শতাংশ। ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট মডার্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৭০ শতাংশ, অর্থ পরিশোধ ৭১ শতাংশ। ফ্লাড ড্যামেজড রুরাল রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্টের কাজ হয়েছে ৯১ শতাংশ, অর্থ পরিশোধ ১০০ শতাংশ। এসব প্রকল্প নিয়ে এলজিইডি চলতি বছরের আগস্টে একটি পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনটি দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংগ্রহ করেছেন। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি প্রকল্পে অনুমোদিত ৯৩৬ কোটি টাকার বিপরীতে ঠিকাদারকে ৯৯৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিমূল্যের চেয়ে ৬০ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের ৪২টি উপজেলায় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে নেওয়া সাউদার্ন কান্ট্রি আয়রন ব্রিজ রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত কাজের মাত্র অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছিল। নথিপত্র অনুযায়ী, চুক্তিমূল্যের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৬২৪ কোটি টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আটটি প্রকল্পের সম্মিলিত চুক্তিমূল্য ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। সম্পন্ন কাজের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হলে মাত্র ৮২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ছাড় করা হয়েছে ২ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সম্পন্ন কাজের মূল্য বিবেচনায় প্রায় ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার প্রস্তাবিত মালিয়ার হাট-কৈখালী হাট সড়কটির কয়েকটি অংশের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক মাসে এসব সড়কে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর কাজ পাওয়া আটটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা মহিউদ্দিন মহারাজ ও তার পরিবারের সদস্যরা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- হরিণপালা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ইএফটিই এন্টারপ্রাইজ, ইটিসিএল (প্রাইভেট) লিমিটেড, ইএফটিই ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, সাউথ বাংলা ট্রেডিং লিমিটেড, শিমু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স তেলিখালী কনস্ট্রাকশন এবং ঈশান এন্টারপ্রাইজেস।
সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই মেরাজুল ইসলামের মালিকানায় রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান- ইএফটিই এন্টারপ্রাইজ, ইটিসিএল (প্রাইভেট) লিমিটেড, ইএফটিই ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড এবং সাউথ বাংলা ট্রেডিং লিমিটেড। মেরাজুলের স্ত্রী শামীমা আখতারের মালিকানায় রয়েছে শিমু এন্টারপ্রাইজ। মহিউদ্দিন মহারাজ নিজে হরিণপালা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক। অন্য দুই প্রতিষ্ঠান মেসার্স তেলিখালী কনস্ট্রাকশন ও ঈশান এন্টারপ্রাইজেসের মালিক মহিউদ্দিনের ছোট দুই ভাই শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে মেসার্স তেলিখালী কনস্ট্রাকশন ও ইটিসিএল (প্রাইভেট) লিমিটেড যৌথভাবে প্রায় ৩৭৫টি কাজের চুক্তি পেয়েছে। এসব কাজের মূল্য ১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
গত বছরের এলজিইডির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদে থাকা কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এসব অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ সম্ভব ছিল না। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজ, সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মেরাজুল ইসলাম, সাবেক নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নূরে আলম শাহীন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার নামও উল্লেখ করা হয়।
গত বছর মহিউদ্দিন মহারাজ, তার তিন ভাই, মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী এবং স্থানীয় এলজিইডি ও জেলা হিসাব কার্যালয়ের ২২ কর্মকর্তাসহ মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে আটটি মামলা করে দুদক।
আটটি প্রকল্পে কাজ আংশিক সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে এসব মামলা করা হয়।
দুদক জানায়, মহিউদ্দিন মহারাজ ও তার আত্মীয়দের নামে নিবন্ধিত আটটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই মূলত অর্থ তোলা হয়েছিল। মামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ছয় কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে এলজিইডির পিরোজপুর কার্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এ কে এম মোজাম্মেল হক খান কারাগারে মারা যান। জেলা হিসাব কার্যালয়ের পাঁচ কর্মকর্তা জামিনে রয়েছেন।
বাকি অভিযুক্তরা পলাতক বলে জানিয়েছেন দুদকের পিরোজপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করা হয়েছে। দ্রুতই আদালতে এর চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। অভিযুক্তদের পিরোজপুর ও ঢাকায় থাকা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদও জব্দ করেছে দুদক।