Image description

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে কঠিন পরীক্ষার মুখে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করাই এখন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রভাবশালীদের দাপট, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, পেশিশক্তির নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনি সহিংসতা ঠেকানো, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের আস্থা তৈরি করার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে ইসিকে। আগামী বছরের ২৭ মে-এর মধ্যে পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথম ধাপের নির্বাচন হবে ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপ ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপ ১৩ মে এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপের নির্বাচন ২৭ মে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ২১ জানুয়ারি প্রায় ৮০০ ইউপিতে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ইসি।

ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি সংঘাতপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে ইউপি নির্বাচন। সর্বশেষ ২০২১-২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশব্যাপী। সাত ধাপে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনি সংঘাত ও হানাহানিতে সারা দেশে ১০১ জন নিহত হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউপি নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ছোট পরিসরে হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এ নির্বাচনের প্রভাব ব্যাপক। চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদের এ নির্বাচন ঘিরে গ্রামগঞ্জে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক ও সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় নির্বাচনি মাঠকে উত্তপ্ত করে তোলে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই হবে নির্বাচন কমিশনের অন্যতম বড় পরীক্ষা। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বাচনি প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে কমিশনের ওপরও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারেও বলে মনে করছেন তারা।

তবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি এবং প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে পারে কমিশন। এ ছাড়া নির্বাচনের দিন ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কমিশনের আরেকটি বড় দায়িত্ব। ঝুঁঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা এবং অনিয়মের অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া; ভোটার যেন ভয়ভীতি ছাড়াই কেন্দ্রে যেতে পারেন এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে কমিশনকে। একই সঙ্গে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট কিংবা ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

ইউপি নির্বাচনে কমিশনের চ্যালেঞ্জ কী কী জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ইসিকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। চ্যালেঞ্জর বিষয়ে তিনি বলেন, প্রার্থীরা অনেক সময় নির্বাচনি আচরণবিধি ও নিয়মকানুন মেনে চলতে চান না। নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ব্যবহার, অতিরিক্ত খরচ এবং ভোটারদের কাছে টানার জন্য অবৈধভাবে অর্থ প্রদান বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটে, যা মনিটর করা খুব কঠিন হয় ইসির জন্য। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের অফিসাররা নিরপেক্ষভাবে এসব বিষয় না দেখলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

এ বিষয়ে অন্যতম নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের জন্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচন চ্যালেঞ্জ হবে না। সব কাজেই চ্যালেঞ্জ থাকে, তবে এটিকে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ মনে করছে না ইসি। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও ভালো ভোট ও সুন্দর পরিবেশের জন্য প্রয়োজনে ভোটের প্রথম ধাপ দেখে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের চিন্তার কথাও জানান তিনি।