Image description

এক শ্রেণির নাগরিকের অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার খেসারত দিতে হচ্ছে বৈধভাবে বিদেশ যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের। দালাল চক্রের প্রলোভনে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা, জাল নথি, ভুয়া ভিসা ও নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থানের অভিযোগে বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বাড়ছে নজরদারি। ভিসা বাতিলের পাশাপাশি নতুন নতুন শর্ত আরোপ করেছে অনেক দেশ। এতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি ও ঝুঁকিতে পড়ছে বৈদেশিক শ্রমবাজার।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অবৈধভাবে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। তাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ ইতালি, ১৬ শতাংশ গ্রিসে এবং বাকি প্রায় ১ শতাংশ গেছেন মাল্টা ও স্পেনে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৭ হাজার ৮৫৭ বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশ করেছেন। এর প্রভাব পড়ছে বৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের ওপর। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট স্থগিত করে ইতালি। বর্তমানে দেশটিতে বাংলাদেশিদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট স্বাভাবিক হলেও স্বল্পমেয়াদি শেনজেন ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে। এর জন্য অবৈধভাবে প্রবেশের উদ্দেশ্যে কিছু আবেদনকারীর জাল ও ভুয়া নথি ব্যবহারকে দায়ী করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। শুধু ইতালিই নয়, ভিসায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে পূর্ব ইউরোপের দেশ জর্জিয়াও। গত বছরের মে মাস থেকে বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের নাগরিকদের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটি। জর্জিয়ার ভিসা নিয়ে সে দেশ থেকে অবৈধভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় দেশটি এই বিধিনিষেধ আরোপ করে।

এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা বেড়েছে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মিসর, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিসা নিয়ে গিয়ে অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানের মতো বিষয়গুলোকে বিভিন্ন দেশের কড়াকড়ির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অবৈধ অভিবাসন, ভুয়া নথি, ভিসার শর্ত ভঙ্গের কারণে তৈরি হওয়া ভিসার জটিলতার প্রভাব পড়ছে বৈধভাবে বিদেশ যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের ওপর। গত এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের ১৩ দেশ বাংলাদেশি ভিসা প্রত্যাশীদের সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের বাংলাদেশ মিশন যৌথ বার্তায় ভিসা আবেদনকারীদের সতর্ক করে জানায়, জাল নথি, অননুমোদিত এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে ভিসা প্রত্যাখ্যান, সীমান্তে প্রবেশে বাধা, আর্থিক ক্ষতি কিংবা আইনি জটিলতা হতে পারে। অবৈধ অভিবাসনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শ্রমবাজারে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রাণকেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। দীর্ঘদিন নতুন কর্মী নেওয়া বন্ধ করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। কুয়েত, কাতারসহ কয়েকটি বাজারের বাংলাদেশিদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এ ছাড়াও ইউরোপে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অভিবাসন। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন শ্রমবাজার চালু করতে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এসব দেশে কর্মী চাহিদা থাকলেও অবৈধ অভিবাসন, কর্মীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবেশের চেষ্টা, ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা ও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানের মানসিকতার কারণে বাংলাদেশিদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অভিবাসনের খরচ ও প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন অভিবাসন-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষতি শুধু সমুদ্রপথে প্রাণহানি কিংবা বিদেশে আটক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বৈধ শ্রমবাজার, ভিসা প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদেশে যাওয়ার আকাক্সক্ষা বন্ধ করা সম্ভব নয় এবং সেটার প্রয়োজনও নেই। বরং মানুষ যেন বৈধ পথে, সঠিক তথ্য নিয়ে, নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নিয়ে বিদেশে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রথম সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, অবৈধ অভিবাসন, ভুয়া কাগজপত্র ও দালালচক্রের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিদেশগামী কর্মীদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।