Image description

ভেজাল ও দূষিত খাবার জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, অননুমোদিত রং, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং রোগজীবাণুর উপস্থিতি শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতাই সৃষ্টি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই অসুস্থ মানুষের জন্য অনিরাপদ খাবার মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে। পুষ্টিকর খাবারের নামে নিম্নমানের বা দূষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে; রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাও কমে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ২০০টির বেশি ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। শিশু, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এ ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা এবং সবার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করার গুরুত্ব তুলে ধরাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজ উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ ফুড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে দেশে বছরে আনুমানিক ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এর মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মক্ষমতা হারানোর মতো বিষয় রয়েছে। সেমিনারে শিশু ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভেজাল বলতে শুধু নিম্নমানের উপাদান মেশানো বোঝায় না; বরং অননুমোদিত রং, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্য বিপজ্জনক উপাদানের ব্যবহার এবং খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে অনিরাপদ পদ্ধতিও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এ বিষয়ে বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ ও গবেষক ড. ফারজানা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমাদের অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে যা ইমিউন সিস্টেমের ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু খাবারে থাকা ভেজাল কেমিক্যালের কারণে সেই ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে এবং শরীর যেকোনো ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।’ 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে জমা হওয়া ভারী ধাতু (যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ) ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্লেমেশন সৃষ্টি হয়, যা ক্যানসারের মতো রোগের মূল কারণ। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশে গত এক দশকে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর পেছনে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ভেজাল খাদ্য গ্রহণকে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনকোলজিস্টরা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও মারাত্মক। শিশুরা ভেজাল ফাস্টফুড, প্রিজারভেটিভযুক্ত জুস ও কেমিক্যালে পাকানো ফল খেয়ে বড় হওয়ায় তাদের শৈশব থেকেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। 

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আগে যেসব রোগ শুধু বয়স্কদের মধ্যে দেখা যেত, এখন তা শিশুদের মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে। এর মূল কারণ কেমিক্যালের বিষাক্ততা; যা শিশুদের গ্রোথ ও ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে।’ দুধে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘গুরুতর হুমকি’ ও ‘ঘৃণ্য অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করে এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা’ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘শিশুখাদ্য হিসেবে দুধের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সেই দুধে ভেজাল মিশিয়ে শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। 

জনস্বাস্থ্যের জন্য এমন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।’ খাদ্যে ভেজাল কমাতে প্রথমেই উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্যে অনিয়ম পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার ফলাফল জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ শিকদার বলেন, ‘যারা খাদ্যে ভেজাল মেশাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল মেশানো মানুষ হত্যার শামিল অপরাধ।’