Image description

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা অর্থনীতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে, বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি ফেরানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। যার কৌশল ও করণীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইএমএফের পূর্বাভাসকে বর্তমান পরিস্থিতি ও ঝুঁকির একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যায়। প্রবৃদ্ধি কমা এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা একসঙ্গে দেখা দিলে বোঝা যায়, অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, জ্বালানির ঘাটতি ও উচ্চ আমদানি ব্যয় উৎপাদন এবং ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রবাহের মন্থরগতি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারের সীমিত রাজস্ব উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সেবায় ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ কমাচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও খাদ্যে আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় এবং দেশের বাজারদর-দুটির ওপরই চাপ পড়ে।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ও পরিবহন স্বাভাবিক রাখা, মজুতদারি ঠেকানো এবং বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। তবে সবার জন্য বড় আকারের ভর্তুকি দিলে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তিনি আরও বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ঋণপ্রাপ্তি এবং বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল নীতি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে করব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও জরুরি উন্নয়ন ব্যয় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। 

আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দুঃসংবাদ হলেও অপ্রত্যাশিত নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তিন-চার বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটের বেশির ভাগ সূচক এখনো সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও সরকারের উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় অর্থনীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধির চক্রে আটকে যাচ্ছে। মাশরুর রিয়াজ বলেন, প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামলে তা করোনাকাল বাদে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রায় ১১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমবে, ব্যবসার ব্যয় বাড়বে এবং বাজারের চাহিদা সংকুচিত হবে।

তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের সমন্বিত সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তির উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্যসচিব ড. মনজুর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। তবে অর্থনীতির পরিস্থিতি উন্নয়নে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতিও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ।