কারখানায় অভিনব পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রায় অবস্থিত ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি। বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত কারখানাটির প্রতিটি ভবনের ওপর স্থাপিত সারি সারি সোলার প্যানেল, পুকুরের ওপর ফ্লোটিং সোলার ও দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ ফুটপাত সোলার শেড প্যানেলসহ বিভিন্ন উদ্যোগে ওয়ালটন বর্তমানে ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চলতি বছরের মধ্যে ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ দেখে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ব্যতিক্রমী মডেল দেশের অন্য বৃহৎ কারাখানাগুলো অনুসরণ করলে দেশে জ্বালানি সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে। এখন পর্যন্ত ওয়ালটন হাই-টেক পার্কে দেশের সবচেয়ে বড় ফ্লোটিং সোলার প্ল্যান্টে অবকাঠামো স্থাপন করে ২ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চলতি বছরের মধ্যে ৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তাদের।
আগামী বছর ৬ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। ওয়ালটনের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ফ্লোটিং সোলার প্ল্যান্টের সুবিধা হচ্ছে একদিকে যেমন মাছ চাষ করা যায়, অন্যদিকে এর থেকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টরা এসে ফ্লোটিং সোলার প্যানেলের কার্যক্রম দেখে গেছেন। তারা এর নকশাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত যাচাই করেছেন। তারা এ ধরনের কার্যক্রম স্থাপনে আমাদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
তিনি বলেন, প্যানেল ছাড়া এই প্ল্যান্ট তৈরির সব উপাদান দেশীয়। যেমন-ওয়ালটনের ব্যবহৃত রাসায়নিক খালি ড্রাম দিয়ে এ নকশা তৈরি করা হয়েছে। ফ্লোটিং সোলার প্যানেলের নকশা সম্পর্কে ওয়ালটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, জীবাশ্ম জালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হয় ও জ্বালানিরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফ্লোটিং সোলার পদ্ধতিতে কোনো জ্বালানি লাগে না। পুকুরে নিজেদের মাছ খাওয়ার জন্য ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ মাছ চাষ শুরু করে। অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির উৎসও হবে পুকুর। সেইসঙ্গে পুকুরটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কাজে আসছে। এতে পুকুরের মাছের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।
তারা বলেন, বিশ্বে বর্তমানে জ্বালানির যে ঘাটতি তাতে ফ্লোটিং সোলারের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। ডিজেলে এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ পড়ে ৪০ টাকা। আর সৌরবিদ্যুৎ থেকে পড়ে ৩ টাকার কিছু বেশি। ব্যক্তি উদ্যোগে বা অন্য কারখানাগুলো এই মডেল অনুসরণ করে জ্বালানি খরচ কমাতে পারে। যার যার বাড়তি জায়গায় এভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদাও মেটাতে পারেন তারা। জানা যায়, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে চলে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ছুটির দিনে অব্যবহৃত বিদ্যুৎ গ্রিডে চলে যাচ্ছে। এই বিদ্যুৎ যখন গ্রিডে যাচ্ছে তখন ১৩ হাজার পরিবার তা ব্যবহার করছে। বর্তমানে এই কারখানায় যে পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে তা উৎপাদনে ডিজেল ব্যবহার করা হলে মাসে ৬৯ লাখ ৭৯ হাজার ব্যারেল তেল প্রয়োজন হতো। এই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে কার্বন ইমিশন কমেছে ৯ লাখ ৪৩ হাজার ১৬০ টন। মাসে প্রায় ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বিশাল সাশ্রয় হচ্ছে। এ ছাড়া ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এলাকার ফুটপাত সোলার প্যানেল স্থাপন করায় এখানে কর্মরত ১৫-২০ হাজার শ্রমিক রোদ-বৃষ্টিতে সুরক্ষা পাচ্ছে।
আবার বিদ্যুৎও উৎপাদন হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই ফুটপাত সোলার প্যানেলের মাধ্যমে এখন ১ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) অর্থায়নে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, ইএসএস ব্যাটারি এবং সোলার ইনভার্টার উৎপাদনের পথে রয়েছে ওয়ালটন। আগামী মাসেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ এসব পণ্য এখন পুরোপুরি আমদানি করছে।