Image description

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সরগরম দেশের তৃণমূল, বইছে নির্বাচনি হাওয়া। অরাজনৈতিক এ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোতে চলছে নানা সমীকরণ, থাকছে দলীয় সমর্থন। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, জনসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সরব অবস্থানে দলগুলো। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একাধিক চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থী রয়েছে। তবে কেন্দ্র থেকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলমান। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী অনেক এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নামিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও ইউনিয়ন থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে বহুমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২৭ মে পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে।

একক প্রার্থী নির্ধারণের চেষ্টায় বিএনপির কেন্দ্র, মাঠে একাধিক : দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তবে দলীয় প্রতীক ও মনোনয়ন না থাকায় একই পদে একাধিক নেতার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকছে। এ বাস্তবতায় ভোটের মাঠে দলীয় বিভক্তি এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে একজন করে সমর্থিত প্রার্থী রাখার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। তৃণমূলের মতামত, স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয় এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত একজনকে সমর্থন দেবে বিএনপি। বিএনপির পরিকল্পনায় স্থানীয় পর্যায়ের মতামত গুরুত্ব দেওয়া হলেও চূড়ান্তভাবে কাকে দল সমর্থন করবে, সেই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতেই থাকবে। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে বরিশাল সদর উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে চার-পাঁচজন করে প্রার্থী রয়েছেন। তিনি বলেন, দলকে এক্ষেত্রে কঠোর হয়ে একজন প্রার্থী নির্ধারণ করতে হবে। বরিশাল বিএনপির ঘাঁটি, এখানে একক প্রার্থী না হলে ভোটাররা বিভ্রান্ত হবেন।

বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির সামনে কয়েকটি বাস্তব সমস্যার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। শুধু বরিশাল নয়, সারা দেশে একইচিত্র পাওয়া গেছে। দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকায় পুরোনো নেতাদের পাশাপাশি নতুন করে সক্রিয় হওয়া নেতারাও প্রার্থী হতে চাইছেন। কোথাও একই পদে একাধিক নেতা মাঠে রয়েছেন, আবার কোথাও একাধিক পক্ষ নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছে। এ অবস্থায় দলীয়ভাবে একজনকে সমর্থন না দিলে একই দলের একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভোটের মাঠেও দলীয় সমর্থন ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে-এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দলের পক্ষ থেকে একজনকে সমর্থন দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলমান রয়েছে।

আগেই মাঠে জামায়াত : বিএনপির তুলনায় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি আগেই শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়া জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি পরীক্ষা করতে চাইছে। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও সমর্থিত প্রার্থীকে ঘিরে দলীয় সংগঠন সক্রিয় করার কৌশল নিয়েছে তারা। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে সরব দলটির প্রার্থীরা।

আলাদা পথে এনসিপি : স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপিও মাঠ গোছানোর কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে দলটি এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থিতাও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মিত্রতা থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোর আলাদা শক্তি পরীক্ষার চিত্রই সামনে আসছে।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঘিরে ভিন্ন হিসাব : তৃণমূলের নির্বাচনি আলোচনায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। তবে জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় আইনগত যোগ্যতা পূরণ করলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ব্যক্তি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন; তবে দলীয় নামে বা দলীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার চালানোর সুযোগ থাকবে না। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে সরকারি বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে জামায়াতও নির্বাচন কমিশনের কাছে নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে।