Image description

কিছুক্ষণ পরপরই মোবাইলে ভেসে আসছে হুতিদের মিসাইল হামলার সতর্কবার্তা। কখন মিসাইল এসে পড়ে- এই আতঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে। প্রতিনিয়তই এমন মৃত্যুভয় তাড়া করছে সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাজমুল-আরিফদের। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় তাদের মতো অনেক প্রবাসীই কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। পরিবার ও স্বজনদের জীবিকার কথা চিন্তা করে ফিরতে পারছেন না দেশে।

ভীতিকর এমন পরিস্থিতির মধ্যেই থাকতে হচ্ছে তাদের। গত ১০ই অক্টোবর রাতে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় প্রবাসী দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হন। এরপর থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায়। এতে উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন প্রবাসীরা। উদ্বিগ্ন দেশে থাকা এসব প্রবাসীর স্বজনরাও।

রিয়াদে থাকা প্রবাসী নাজমুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা থাকি মিসাইল আতঙ্কে আর পরিবারের লোকজন থাকেন আমাদের মৃত্যুর আতঙ্কে। দিনের মধ্যে আট-দশবারই এমন আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় সবাইকে। সব সময় ভয় কাজ করে, কখন মাথার ওপর এসে মিসাইল পড়ে। এভাবে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালীর অনেক প্রবাসীও আমার সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করছেন। হামলার সময়ে এ বিষয়ে আগে থেকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয় না। মাঝেমধ্যে কোনো নির্দেশনাই পাই না। শুধু যখন মিসাইল আসে, তখন সৌদি আরব থেকে সতর্কবার্তার নোটিফিকেশন আসে।

রিয়াদে অবস্থানরত আরিফুল ইসলাম নামে আরেক প্রবাসী বলেন, আতঙ্ক নিয়েই কাজে যেতে হয়। কিছু করার নেই। হামলা হলে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রত্যেকের মোবাইলে এক ধরনের নোটিফিকেশন দেয়া হয়। সেটা পেয়েই আমরা করবো কি? কাজ তো আমাদের করতেই হবে। আতঙ্কের মধ্যেই কাজ করি।

রিয়াদের বাসিন্দা আরেক প্রবাসী আনোয়ার হোসেন বলেন, যেভাবে দিন যাচ্ছে, তাতে কতোদিন এমন পরিস্থিতি চলবে, তা ভেবেই চিন্তা হচ্ছে। এর মধ্যে সৌদি আরবে ইকামা করতেও অনেক টাকা লাগে। যা আয় হয়, তার বড় একটি অংশ ইকামা করতেই চলে যায়।

এদিকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের কারণে দেশে ছুটিতে আসা প্রবাসীদের ভোগান্তি বেড়েছে। ঢাকা থেকে সৌদিগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে ফিরতে পারছেন না অনেকে। কেউ কেউ এরই মধ্যে কোম্পানি ও কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। আবার কেউ বিকল্প বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে ফেরার চেষ্টা করছেন।

রিয়াদ বিমানবন্দরের অদূরে অবস্থানকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক প্রবাসী বলেন, হুতিদের হামলা নিয়ে আমরা যে কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যারা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি তাদের বলে বোঝাতে পারবো না। কিছুদিন আগেও এমন হামলা হলো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গায়। তখনো অনেক বাংলাদেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবার এখন হুতিদের হামলা-মিসাইল আতঙ্ক আমাদের কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে। কোথাও গিয়ে মনের মধ্যে শান্তি পাচ্ছি না। ওদিকে দেশে থাকা বাবা-মা, স্ত্রী তারাও কেউ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না। এভাবে আর কতোদিন চলবে আল্লাহ মাবুদ ভালো জানেন।

হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আহত বাংলাদেশিরা: গত ১০ই অক্টোবর আনুমানিক রাত ৩টা ১৫ মিনিটে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর উপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে। এ হামলায় মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি এবং আহতদের মধ্যে ২৪ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন- বগুড়ার মো. শাহেদ আহম্মদ ও কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। তাদের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১১ জন কর্মী এবং ১৩ জন ওমরাহ’র যাত্রী। তারা রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজন কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল। তারা হলেন- হাফেজ হাসান (ঢাকা), কাজী নুরুল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) এবং মো. ওমর ফারুক (সৌদিপ্রবাসী কর্মী)। ওদিকে ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই বাংলাদেশি হলেন- সাফকাত রহমান (নওগাঁ) ও মো. দাউদুল ইসলাম (কুমিল্লা)। সাফকাত রহমান অচেতন অবস্থায় আছেন। রিয়াদ মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। দু’জনেরই বাড়ি ঢাকা। প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. আব্দুল্লাহ (ঢাকা)। সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় চিকিৎসাধীন আরমান হোসেনসহ (ঢাকা) তিন বাংলাদেশি কর্মী। কিংডম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. রফিক মিয়া। কিং খালেদ মেডিকেল সিটিতে চিকিৎসাধীন ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ বাংলাদেশি কর্মী হলেন সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ এবং সোহবে সাদেক মো. শাহজাহান সরকার। এ ছাড়া এজতাহ সনদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল; সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে নাজমা আক্তার এবং সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের আলসাহাফা শাখায় উমায়ের ও আব্দুল্লাহ কামিল চিকিৎসাধীন রয়েছেন।