সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে তদবিরের চাপের কারণে সরকারি কাজে বিঘ্ন ঘটছে। স্বাভাবিক কাজকে গতিশীল করতে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ কয়েকজন সচিব ও আইজিপি উপস্থিত ছিলেন। সচিবালয়ে সম্প্রতি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সাবেক আমলা এবং সাধারণ মানুষের তদবিরের ভিড় বেড়েছে। চাকরিপ্রার্থী, বদলি, পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন সুযোগসুবিধা ও ইজারা পাইয়ে দেওয়ার মতো অসংখ্য দাবি নিয়ে তারা হাজির হচ্ছেন। সূত্রমতে, সচিবালয়ে এত লোকের সমাগম বিষয়টি নজর এড়ায়নি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও। সম্প্রতি এ নিয়ে তিনি বিষয়টি দেখতে মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রবেশাধিকার সীমিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে বৈঠক করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সবাইকে অবহিত করেন যে, সচিবালয়ে দর্শনার্থী আধিক্যের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। সচিবালয়ে এত বেশি লোকের আগমন দেখতে চান না তিনি। এতে মন্ত্রীদের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এটাও বলেন যে, যৌক্তিক কারণে সভা-সেমিনারে আসা ঠিক আছে। বৈঠকে আরেক সচিব বলেন, সচিবালয়ে এত লোক কেন আসে, কী করে, সে বিষয়ে সম্প্রতি জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। পরে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদকে দেখতে বলেছেন। মিটিং করতে বলেছেন।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত অফিস করছেন। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরা অফিস করেন। সেখানে অধিক মানুষের যাতায়াত আর নানা তদবিরে অনেকটাই বিব্রত মন্ত্রীরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও পড়ছেন তদবিরকারীদের বিড়ম্বনায়। বৈঠকে পুলিশের আইজি বলেন, পুলিশের কেউ অনৈতিকভাবে প্রবেশ করানোর তথ্যপ্রমাণ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় পুলিশকে নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, কোনো গাড়িতে অননুমোদিত কেউ যেন প্রবেশ না করেন। প্রত্যেক গাড়ি ভালো করে তল্লাশি চালিয়ে প্রবেশের অনুমতি দিতে বলেন। দলীয় নেতা-কর্মী, এমপি বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা যে-ই হোক কারও পাস বা অনুমোদন না থাকলে যেন গাড়িতে প্রবেশ না করেন সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় আলোচনা হয়, প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে আলাদা প্রবেশ মেশিন বসানো যায় কীভাবে এবং দ্রুত সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে যাতে এক মন্ত্রণালয়ে এসে অন্য মন্ত্রণালয়ে কেউ যেতে না পারেন।
বৈঠকের পরপরই সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে প্রবেশ গেটগুলোতে কড়া পাহারা। প্রত্যেক গাড়ি প্রবেশের সময় তল্লাশি চলছে। গত পাঁচ মাসে অনিয়মের মাধ্যমে দর্শনার্থী সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার কারণে ১৫ জন পুলিশকে বদলি ও শাস্তির আওতায় এনেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে সচিবালয়ে এখন সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী সারের নতুন ডিলার নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেতে নানাভাবে তদবির করছেন। সংসদ সদস্যরাও প্রতিদিন আসছেন। গতকাল দুপুর ১টার দিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তিনজন কর্মকর্তা বলেন, এই হাফবেলাতে ৩০ জনের মতো সংসদ সদস্য দেখা করেছেন মন্ত্রীর সঙ্গে। গত কয়েকটি কর্মদিবসে দেখা গেছে মন্ত্রী সচিবদের ওয়েটিং রুমের বাইরেও করিডরে অসংখ্য মানুষের চলাফেরা।
বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেছে উপজেলা কমিটি। সেই তথ্য জেলা থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একজনের নাম চূড়ান্ত হবে প্রতি ইউনিয়নে, যা করবে মন্ত্রণালয়। কৃষিসচিব মো. সেলিম খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই-এক সপ্তাহের মধ্যে ডিলারশিপ চূড়ান্ত হবে। তবে তদবিরকারীদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন নেতা-কর্মীরা স্বরাষ্ট্রে যাচ্ছেন তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার-পিআইও এবং বরাদ্দ পেতে। শিক্ষাতে ভিড় দেখা গেছে অসংখ্য শিক্ষা ক্যাডারদের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত ডাক্তারদের পদচারণা পছন্দের হাসপাতাল বা ঢাকায় থাকার জন্য।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, সব সরকারের সময়ই তদবিরবাজ থাকেন। তারা সকালে এসে নানা মন্ত্রণালয় ঘুরে বেড়ান। সরকার হার্ডলাইনে গেলে এসব ঠিক হয়ে যাবে।