Image description

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ৭ অক্টোবর দিবাগত রাত ১২টা থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। তবে নদীতে জেলেদের মাছ ধরা ঠেকাতে এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশাসনিক অভিযান যতই জোরদার হোক, স্থানীয় রাজনৈতিক সমর্থন না থাকলে মেঘনায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থ ও জনবলসংকট। ফলে মা ইলিশ রক্ষায় এবার প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকার দিকেই থাকছে বড় নজর।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিষেধাজ্ঞাকালীন তাঁদের প্রধান ফোকাস মেঘনা তীরবর্তী হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল। তার ওপর ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পাওয়া যাবে, তা নিয়েও চিন্তিত তাঁরা।

হিজলা উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ফারুক খান বলেন, সভা-সেমিনার করে মা ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা না চাইলে ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। রাজনৈতিকভাবে সমর্থন না থাকলে মা ইলিশ নিধন উৎসব চলবে।

হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাব হোসেন খোকন দপ্তরী বলেন, ‘এবার নদীতে কোনো জেলে নামবেন না। আমরা ওরাকুল মাছঘাটে সব জেলেকে নিয়ে সভা করেছি। তাঁদের বলেছি, কোনো হুমকি-ধমকি নয়। সোজা কথা হলো—নদীতে নামা যাবে না।’

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক দিপেন জমাদ্দার বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় উপজেলা টাস্কফোর্সের সভা হয়েছে। সেখানে নৌ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজিব আহসান সবাইকে ইলিশ সম্পদ রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।’

মেহেন্দীগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুলাদী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, ‘দুটি উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা কঠিন। তা ছাড়া প্রকল্প না থাকায় বরাদ্দ সংকট। এর মধ্যেই স্থানীয়দের সহযোগিতায় কাজ করতে হবে।’

জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় এবারের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, গত জুনে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প শেষ হয়েছে। যার মাধ্যমে অভিযানের বড় বাজেট মিটত। এখন রাজস্ব খাত থেকে ব্যয় মেটাতে হবে। বাজেট যদি আগের মতো হয়, তাহলে কীভাবে ২২ দিনের অভিযান চলবে। আগের বাজেটে দুই দিনে নৌযানের তেল শেষ হয়ে যাবে।’

অভিযান প্রসঙ্গে হাদিউজ্জামান বলেন, ‘হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনায় এবার দুটি লঞ্চ থাকবে। তা ছাড়া স্পিডবোটও থাকবে। তাঁরা চেষ্টা করছেন মা ইলিশ রক্ষায় নদীতীরবর্তী ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করতে। এ জন্য প্রতিটি ঘাট থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ৫ জন জনবল নিতে ইউএনওদের চিঠি দিয়েছেন। যদিও মা ইলিশের খনি হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে এখনো কোনো কর্মকর্তা নেই।’ তিনি বলেন, জেলেদের নদীতে না নামতে স্থানীয় এমপিদের কাছেও এ বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

জেলেদের প্রণোদনা প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, ২২ দিনে প্রতি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। জেলায় ভিজিএফ চাল পাচ্ছে ৭৯ হাজার ৮৯০ পরিবার। যদিও জেলায় জেলে রয়েছেন ৮৪ হাজার ২৯৫ জন।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার আগমুহূর্তে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। তবে দাম তুলনামূলক বেশি। বরিশাল নগরের বৃহৎ ইলিশ মোকাম পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে গত শনিবার এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ইলিশের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। গত শনিবার প্রতি মণ ইলিশের দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একইভাবে এলসি সাইজ (৮০০-৯০০ গ্রাম) প্রতি কেজি ২৩০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২০০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, তারা টাস্কফোর্স সভা করে নদীতীরবর্তী বাজারঘাটে জেলেদের সচেতন করছেন। কিন্তু আমাদের একটি ইলিশ প্রকল্প ছিল। সেটা না থাকায় এবার আর্থিক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সেই প্রকল্প থেকে প্রতি উপজেলায় ৫-৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন রাজস্ব খাত থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হবে। তেলের দাম বাড়ায় এই অর্থে অভিযান অব্যাহত রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে। তিনি বলেন, মা ইলিশ রক্ষা জাতীয় ইস্যু। এ জন্য এমপি-মন্ত্রীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, এ বছর সারা দেশে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ টন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ধরা হয়েছে ৪ লাখ টন।