Image description

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ পাঁচটি। তবে কর্মরত দুজন। তাঁদের একজন আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একজন শিক্ষককে পাঠদানের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

শিক্ষকসংকটের এই চিত্র দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, সরকারি-বেসরকারি কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা—প্রায় সব স্তরে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই সংকট প্রকট। দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়।

শিক্ষাবিদেরা বলছেন, শিক্ষকসংকটের কারণে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়ছে। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর হলেও তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক কম। এ জন্য মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না। তাঁদের এই পেশায় আকৃষ্ট করতে পেশার মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো করা প্রয়োজন।

এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে ৬০ বছর’। দিবসটি উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এবার দিবসটি উপলক্ষে ১০০ জন শিক্ষককে ১ লাখ টাকা করে পুরস্কার ও সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আগে ১২ জন শিক্ষককে ২ লাখ টাকা করে দেওয়া হতো।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। এ সংকট নিরসনে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কেবল শিক্ষকদের জন্য আলাদা পে-স্কেল গঠন করা উচিত। তাহলে মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মামলা-জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের প্রায় ৩৬ হাজার পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ২ হাজার ২০০। পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ নিয়ে করা মামলাটি সম্প্রতি নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পেলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হবে।

প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে ৩৬ হাজার সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি পেলে তাঁদের পদ শূন্য হবে। বর্তমানে সহকারী শিক্ষকের নিয়োগযোগ্য শূন্য পদ রয়েছে ২ হাজার ২০০। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পর সহকারী শিক্ষক পদে শূন্য পদ দাঁড়াবে ৩৮ হাজারের বেশি।

সরকারি যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে, সেগুলোতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকেরা। এতে তাঁরা নিয়মিত পাঠদান করতে পারছেন না।

মাত্র দুজন শিক্ষক থাকা টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাকে প্রধান শিক্ষকের দাপ্তরিক অনেক কাজের জন্য বিভিন্ন সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে বাকি একজন শিক্ষকের পক্ষে সব শ্রেণির, সব বিষয়ের পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীরাও লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ছে।’

মাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকেরও ঘাটতি

মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটও রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষকসংকট বেশি। ফলে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এসব বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে ইসলাম শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা কিংবা অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটের পাশাপাশি দেশের ৬৯৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকের তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য রয়েছে।

বরগুনা জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকেরও ঘাটতি রয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওহাব বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট দীর্ঘদিনের। আমাদের আইসিটি শিক্ষক, কৃষি শিক্ষক ও হিন্দু ধর্ম শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষক নেই। বিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষক নেই। সীমিতসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করানোর চেষ্টা করছি।’

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘শিক্ষকসংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, অচিরেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।’

সংকট সরকারি কলেজেও, ভোগান্তি বেশি গ্রামে

দেশে সরকারি কলেজ ৩১৬টি। এসব কলেজে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৫ হাজারের বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের হিসাবে কলেজে শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা ২ হাজার ১৭৮টি। এ ছাড়া আত্তীকৃত কলেজে দুই হাজারের বেশি প্রভাষকের পদ ফাঁকা রয়েছে।

শহরের চেয়ে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার কলেজে শিক্ষকের সংকট বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এই কলেজে শিক্ষকের ৪২টি পদের মধ্যে ২১টিই শূন্য। এর মধ্যে রসায়ন, দর্শন ও আইসিটি বিষয়ে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। ওই কলেজের প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, ‘রসায়নের মতো বিষয়ে শিক্ষক না থাকা আমাদের সঙ্গে অন্যায়। একজন শিক্ষক ছিলেন, তাঁকেও বদলি করা হয়েছে। এখন আমরা কার কাছে পড়ব?’

নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন। কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিষয়টি সবার জন্য বাধ্যতামূলক হলেও একজন শিক্ষকের পক্ষে এত শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে একজন অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে।

দেশের নামকরা ঢাকা কলেজেও রয়েছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে কলেজটিতে শিক্ষার্থী প্রায় ২ হাজার ৪০০। এসব শিক্ষার্থীর জন্য আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যাসহ অন্য বিষয়ের শিক্ষকেরাই আইসিটির ক্লাস নেন।

বেসরকারিতে মিলছে না যোগ্য শিক্ষক

বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। সূত্র জানায়, নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি সপ্তম বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে নিবন্ধিত প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। ওই নিয়োগে ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক-প্রভাষক পদের বিপরীতে নিয়োগের সুপারিশ পান মাত্র ১১ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। ফলে ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য থেকে যায়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

দেশে এমপিওভুক্ত ৩৪ হাজার ১২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯৪ শিক্ষক এবং ২ লাখ ৬ হাজার ৬৯৯ কর্মচারী কর্মরত আছেন।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট কাটাতে সরকার গত ১২ এপ্রিল অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে পুল করে নিয়োগের নির্দেশ দিয়ে অফিস আদেশ জারি করে। আদেশে বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পরামর্শে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি, গভর্নিং বডি বা অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন নিয়ে ‘সাময়িকভাবে’ পুল থেকে শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

কারিগরিতে আট হাজার পদ শূন্য

দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের কথা বলা হলেও এই খাতেও শিক্ষকসংকট দীর্ঘদিনের। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে দেশে ২৪৮টি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৬১টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ৫১টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া একটি টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও একটি ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার ৮৪৪টি অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নিয়োগ হলেও এখনো অর্ধেকের বেশি শিক্ষক পদ খালি রয়েছে।

সংকটের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকটের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকসংকটে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় তাদের শিখন ঘাটতি থাকছে। এর খেসারতও তাদের দিতে হচ্ছে।

বরগুনা জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ঈশান করিম বলে, ‘স্কুলে ৫২ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন ২৫ জন। এ কারণে একই শিক্ষককে অনেক বিষয়ে ক্লাস নিতে হয়। বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলোর শিক্ষক নেই। এতে কঠিন বিষয়গুলো বুঝতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে।’

শিক্ষাবিদেরা বলছেন, নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হলে একটি শিক্ষাবর্ষে যে ঘাটতি তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে তা পূরণ করা কঠিন। শিক্ষকসংকট দূর করার পাশাপাশি কোথায় কত শিক্ষক প্রয়োজন, কোন বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কীভাবে শিক্ষক ধরে রাখা যাবে—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষকসংকট ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এই সংকট দূর করতে হবে।