দেশে নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতাও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। ঘরে-বাইরে কোথাও নারী আর নিরাপদ নয়। কর্মক্ষেত্র বা গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কম বয়সি কন্যাশিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারীরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এখন নারীর প্রতি সহিংসতামূলক বিভিন্ন রিল বা স্ট্যাটাস দিয়ে এই সহিংসতাকে আরও উসকে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তাদের অধিকাংশই প্রান্তিক। রাষ্ট্রকাঠামোয় এই নারীদের কার্যত গুরুত্ব দেওয়া হয় না বললেই চলে।
পুলিশের জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর দেওয়া তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মোট নারী সহিংসতার ২৭ হাজার ৯১১টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৭ হাজার ১৯৬ জন। এ ছাড়া অন্যদের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার ৮২০টি নারী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সময় ১০ জন নারীর ওপর অ্যাসিড ছুড়ে মারা হয়। ৩৭১ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ৭১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়। ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় ৫৯৭ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয় ৮৮৩ জন। ছয়জন নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়। অন্যান্য সহিংসতার শিকার হয় ১ হাজার ১৯৭ জন।
যৌতুকের কারণে ২৯১ জনকে নির্যাতন করা হয়। অথচ ২০২৫ সালে ১২ মাসে নারী নির্যাতনসংক্রান্ত মোট ৩২ হাজার ৩৮৬টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে স্বামীর মাধ্যমে ১৮ হাজার ৬২৬টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। চলতি বছর আরও চার মাসের নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এ নির্যাতনের ঘটনা ২০২৫ সালের রেকর্ডকৃত ঘটনার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ১ হাজার ২৮ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। আর যৌতুকের কারণে ৩৯৬ জন নির্যাতিত হন। ধর্ষণের শিকার হন ১ হাজার ১০৭ জন। ৯৯৯-এ কর্মরতরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আগের চেয়ে পারিবারিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার নারীরা তাদের কাছে বেশি অভিযোগ করছেন।
কেস স্টাডি-১ : নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার একটি গ্রামে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এক নারীকে রবিউল আউয়াল নামে একই গ্রামের বাসিন্দা ধর্ষণ করে। প্রায় ৮ মাস আগে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় ভুক্তভোগীর। এরপর তিনি চার বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন। সেখানে প্রতিবেশী রবিউল সেই নারীকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করত। পরে সুযোগ পেয়ে তাকে ধর্ষণ করে।
কেস স্টাডি-২ : চট্টগ্রাম নগরের বন্দর থানার ২ নম্বর সাইট আদর্শপাড়া এলাকায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর সানজু আক্তার নামে এক নারীকে তার স্বামী মোহাম্মদ জাবেদ গলা কেটে হত্যা করে। পুলিশ সূত্র বলছে, জাবেদ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। এ নিয়ে সানজুর সঙ্গে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো। ঘটনার দিন ঝগড়ার এক পর্যায়ে জাবেদ সানজুর গলায় ছুরি দিয়ে আঘাত করে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এখন নারীর প্রতি সহিংসতামূলক যে রিল বা স্ট্যাটাস আসছে এগুলো সহিংসতা বৃদ্ধির একটি কারণ। ছেলেদের বাড়ি থেকে সংসার শুরুর পর স্ত্রীর সঙ্গে সে কেমন আচরণ করবে তা শেখানো হয় না।
মানুষের ধৈর্যহীনতা পারিবারিক সহিংসতার পেছনে অন্যতম কারণ। যখন কোনো পরিবারে সহিংসতার ঘটনা ঘটে তা বসে মীমাংসা করার প্রচলনও দেশে নেই। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি নারীর প্রতি সহিংসতাসহ অন্য নির্যাতন ও অপরাধপ্রবণতাগুলো বাড়ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা দমনে রাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি আইন ও সুরক্ষার জন্য নীতিমালা আছে। বেশ কিছু সরকারি ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ আছে।
কিন্তু এরপরও এই সহিংসতা রোধ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও নারী সহিংসতা বৃদ্ধির একটি কারণ। এখনো সমাজের একটি বড় অংশ নারী নির্যাতনকে অপরাধই মনে করে না। এরা মনে করে নারী কথা না শুনলে বা নির্যাতনকারী মেজাজ হারালে নারীর ওপর প্রতিশোধ নিতেই পারেন। তিনি বলেন, মৌখিকভাবে প্রান্তিক নারীদের নিয়ে সভা-সেমিনারে নানা কথা বলা হলেও তাদের সুরক্ষায় কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এ অবস্থায় নির্যাতনমনস্ক পুরুষরা নির্যাতন করলেও তাদের বিচার হবে না এমনটি তারা ধরে নেন।