Image description

রাজধানীর ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ নতুন কোনও ঘটনা নয়। অভিযান হয়, দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের জন্য পথচারীদের দখলে ফেরে ফুটপাত। এরপর আবার বসে দোকান, শুরু হয় বেচাকেনা ও বাড়তি চাঁদা তোলা। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের ইঁদুর-বিড়াল খেলা।

দুদিন আগে রাজধানীর মিরপুরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর পুরোনো সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে, ফুটপাতে হকারদের বসাচ্ছে কারা, আবার উচ্ছেদই বা করছে কারা? সরকারি সংস্থা যখন ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায়, তখন কার আশ্রয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে আবার দোকান বসে? আর প্রতিদিন শত শত টাকা দিয়ে ফুটপাতে ব্যবসার সুযোগই বা কে দেয়?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের হকার ব্যবসাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় দখল চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে চক্রের আশ্রয়দাতাও বদলায়। তবে ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ের কাঠামোর কোনও পরিবর্তন হয় না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করা হয়। কোথাও আলাদাভাবে দিতে হয় বৈদ্যুতিক বাতির টাকা। এলাকাভেদে একটি দোকান থেকে দিনে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থের একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী লোকজন এবং প্রশাসনের অসাধু সদস্যদের কাছে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উচ্ছেদ হয়, আবার বসে

রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাত ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাতকেন্দ্রিক দখল ও চাঁদাবাজিতে কয়েকশ’ ব্যক্তি সক্রিয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে তাদের অনেকের ছত্রচ্ছায়া বদলেছে, কিন্তু ফুটপাত থেকে অর্থ আদায়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের ভাগ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনেরও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে যায়। ফলে একদিকে সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালায়, অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সহায়তায় কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ফুটপাতে দোকান বসে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানেই উচ্ছেদ অভিযানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অভিযানে সামনে থাকা হকারের দোকান সরানো হয়, কিন্তু তাকে সেখানে বসানোর পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চক্রের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমন হলেও হতে পারতো যে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের কেউ তার জীবন ও জীবিকার তাগিদে কিছু পণ্য নিয়ে ফুটপাতে বসেছেন, তাকে কোনও চাঁদা গুনতে হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে এটা হচ্ছে না। প্রতিটি ফুটপাত দখলের ক্ষেত্রেই অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তির হাত রয়েছে। তারাই বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে ফুটপাতের দুই পাশে হকার বসাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাতের সঙ্গে সড়কের অর্ধেক অংশও ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।’

তার মতে, শুধু হকার সরিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানের সময় নিরীহ হকারদের ওপর বল প্রয়োগ করে কোনও লাভ হয় না। দুই দিন পর আবার দখল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফুটপাত দখলের পেছনে থাকা রাজনৈতিক শক্তির মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।’

একই সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে হলিডে মার্কেট এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় যথাযথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হকার বসানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে ‘হলিডে মার্কেট’ বাস্তবে রূপ দিতে পাইলট প্রোগ্রামও হাতে নেওয়ার কথা বলেন।

প্রযুক্তিতে নজরদারির পরামর্শ

ফুটপাত পুনর্দখল ঠেকাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তি খাতে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মাইসফট হ্যাভেনের (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভির সঙ্গে এআই ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে অবৈধ স্থাপনা বা নতুন করে দখলের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক বার্তা দেওয়া সম্ভব।

তার মতে, জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ফুটপাতের সীমানা চিহ্নিত করে ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা হলে কোথায় বৈধ ও কোথায় অবৈধ দখল হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। পাশাপাশি নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য অ্যাপ বা হটলাইন চালুরও পরামর্শ দেন তিনি।

বদলে গেছে মিরপুরের ফুটপাত

৩০ সেপ্টেম্বর হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর রাজধানীর মিরপুরে আবারও অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এরপর থেকে মিরপুরের বেশ কয়েকটি এলাকার ফুটপাতের দৃশ্য বদলে গেছে।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বর, ২ নম্বর গোলচত্বর, ১২ নম্বর ও শেওড়াপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ফুটপাত ফাঁকা। হকারের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। কোথাও দুয়েকটি টং দোকানের কাঠামো থাকলেও পণ্য সাজিয়ে বসার দৃশ্য দেখা যায়নি। ১০ নম্বর গোলচত্বরের আশপাশেও আগের মতো ফুটপাতজুড়ে দোকান নেই। পথচারীরা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করছেন। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংও কমেছে। তবে আশপাশে কয়েকজন হকারকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে।

‘অভিযান যায়, আমরা আবার বসি’

ফুটপাতে ব্যবসার সুযোগ বন্ধ হওয়ায় ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন হকাররা। মিরপুর হোপ স্কুলের পাশের ফুটপাতে পোশাক বিক্রি করা এক হকার বলেন, ‘আমরা এখন কী করে খাবো? সরকার আমাদের বসার জায়গা করে দিক। তা না হলে বসতে দিক।’

আরেক হকার বলেন, ‘আমাদের সংসার আছে, বউ-বাচ্চা আছে। নিজেদের চলার তাগিদেই আমরা বসি। আমরা তো জানি না কখন মোবাইল কোর্ট আসবে। জানলে আগে দোকান সরিয়ে দিতাম।’

হকারদের কয়েকজন বলেন, উচ্ছেদের পর কিছু দিন তারা বসতে পারেন না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ফুটপাতে ফিরে আসেন।

তাদের মতে, ‘অভিযান চালায়, উনারা গেলে আমরা আবার বসি। কী করবো? জনদুর্ভোগ করে আমরাও বাঁচতে চাই না। আমাদের টেকসইভাবে একটা ব্যবস্থা করে দিলে তো সমাধান হয়ে যায়। তাহলে রাস্তা দখল করে বসতে হবে না।’

‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়’

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ তারা মেনে নেবে না। সংগঠনটির বক্তব্য, ফুটপাত দখলমুক্ত করার নামে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া সমস্যার সমাধান নয়।

তারা অবিলম্বে হকার আইন প্রণয়ন, নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের বসার ব্যবস্থা, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ, হকারদের তালিকা তৈরি এবং হকারদের ওপর ‘নিপীড়ন’ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

দক্ষিণ সিটি ‘হার্ড লাইনে’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সড়ক ও ফুটপাত জনগণের চলাচলের জন্য। অনুমোদিত স্থানের বাইরে অবৈধভাবে হকার বসা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম কয়েক মাস মানবিকতা বিবেচনায় ছাড় দিয়েছি। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্থানে বসার জন্য অনুমোদনেরও ব্যবস্থা করেছি। এবার হার্ড লাইনে যাবো।’

ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, অনুমোদিত স্থান ছাড়া সড়ক বা ফুটপাতে হকার বসলে মালামাল ক্রোকের পাশাপাশি মামলা করা হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে চলমান অভিযানও অব্যাহত থাকবে।

উত্তর সিটিরও ‘জিরো টলারেন্স’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মূল সড়ক ও ফুটপাত দখল না করে বরাদ্দ করা জায়গায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাদের বলা হয়েছিল।

তার অভিযোগ, অনেকে সেই নির্দেশনা না মেনে অননুমোদিত স্থানে ব্যবসা করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছেন।

হকার উচ্ছেদে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, নগরবাসীর চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং নগরীর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অভিযান চলবে। এতে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ বলছে মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের।

তিনি বলেন, ‘তারা যেন আবার স্থায়ীভাবে বসতে না পারে, এ জন্য আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে।’

তবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি মূলত সিটি করপোরেশনের মনিটরিং করার কথা। তারাই প্রধান অথরিটি। তারা যদি হকার উচ্ছেদে সহযোগিতা চায়, পুলিশ তা করছে। পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকেও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে, যেন হকাররা আবার বসতে না পারে।’

একদিকে দুই সিটি করপোরেশন বলছে, অনুমোদনহীনভাবে হকার বসতে দেওয়া হবে না। পুলিশও বলছে, পুনর্দখল ঠেকাতে নজরদারি চলছে। অন্যদিকে হকারদের বক্তব্য, উচ্ছেদের কিছু দিন পরই তারা আবার ফুটপাতে ফিরে আসেন। বিভিন্ন এলাকায় দোকান বসানো ও দৈনিক টাকা আদায়ের অভিযোগও বহুদিনের।

এই বাস্তবতায় শুধু হকার উচ্ছেদের মধ্যেই সমস্যার সমাধান দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ফুটপাতে দোকান বসিয়ে অর্থ আদায়কারী ব্যক্তি ও চক্রকে শনাক্ত না করলে উচ্ছেদ অভিযান বারবার একই জায়গায় ফিরে আসবে। কারণ ফুটপাতের সামনে যে হকার বসে আছেন, তিনি এই ব্যবস্থার দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু তাকে সেখানে বসাচ্ছে কারা, টাকা নিচ্ছে কারা এবং উচ্ছেদের পর আবার বসার সুযোগ করে দিচ্ছে কারা, স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের খুঁজে বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।