Image description

স্থানীয়ভাবে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে সরকার যে রেয়াতি শুল্ককর সুবিধা দিচ্ছে, তা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে সম্পূর্ণ তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানি করছে। এমনকি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ভিআরএফ (ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) এসি আমদানির করছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে সরকার একদিকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত স্থানীয় এসি ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে। তারা হায়ার বাংলাদেশের আমদানি, উৎপাদন সক্ষমতা, আইআরসি এবং রেয়াতি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরের কনকর্ড টাওয়ারের নবম তলায় গেলে, সেখানকার কর্মকর্তারা প্রতিবেদককে প্রায় দুই ঘণ্টার বসিয়ে রাখলেও কোনো বক্তব্য দেননি। জানতে চাইলে অফিসটির একজন কর্মী কালবেলাকে বলেন, ‘স্যাররা লাঞ্চে গেছেন। আপনি চলে যেতে পারেন। চাইলে বসতেও পারেন। পরে দুই ঘণ্টার বেশি সময় বসে থাকলেও হায়ার বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টরা প্রতিবেদকের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে সুবিধা দেশে এসি শিল্প গড়ে তুলতে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার অংশ হিসেবে সরকার শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াতি সুবিধা দিয়ে আসছে। এর উদ্দেশ্য দেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ সুবিধা নিতে হলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। এসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কম্পোনেন্টের মধ্যে অন্তত তিনটি দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হয়। এগুলো হলো ইনডোর ইউনিট, আউটডোর ইউনিট, কনডেনসর, এভাপোরেটর এবং সাকশন অ্যান্ড ডিসচার্জ পাইপ। এ জন্য শুধু উৎপাদনের ঘোষণা দিলেই হয় না; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতাও থাকতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হায়ার বাংলাদেশ এসব শর্তের আওতায় সুবিধা নেওয়ার পরও ওই কম্পোনেন্টগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করছে। অভিযোগটি সত্য হলে, তা সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

হায়ার বাংলাদেশের আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে একই ই-টিআইএন ও ঠিকানার অধীনে প্রতিষ্ঠানটির নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) ও কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে হায়ার একদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইআরসির আওতায় সুবিধা নিচ্ছে, অন্যদিকে কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহার করে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আনছে।

একই বিআইএন ও টিআইএনের অধীনে এভাবে দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহারের বৈধতা এবং এর মাধ্যমে রেয়াতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, আমদানি ও উৎপাদন—দুই কার্যক্রমে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোন শুল্ককর সুবিধা নেওয়া হয়েছে, তা বিল অব এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ক্যাপিটাল মেশিনারিজে ৯৮টি রেডিমেড এসি হায়ার বাংলাদেশের ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে ৩ লাখ বিটিইউ ক্ষমতার সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আমদানি করেছে। এগুলো মূলত ভিআরএফ এসি। এ সময়ে মোট ৯৮টি রেডিমেড সেন্ট্রাল এসি আমদানি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এসি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করা হয়েছে।

সরকার শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সম্পূর্ণ তৈরি এসিকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ দেখিয়ে আমদানি করা হলে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এ ধরনের পণ্য প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত মূলধনি যন্ত্র কি না, নাকি সরাসরি বিক্রিযোগ্য ফিনিশড গুডস, তা কাস্টমস নথি ও পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এসি ছাড়াও হায়ার ৩৬৯ লিটার ধারণক্ষমতার ১৪৮টি রেডিমেড চেস্ট ফ্রিজার আমদানি করেছে। পাশাপাশি আমদানি করা হয়েছে ৪৪৮টি এসি কম্প্রেসার ও ৪৪৮টি এসি মোটর।

তিন বছরে ৪৫ হাজার ওয়াশিং মেশিন হায়ার ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন আমদানির তথ্যেও বড় পরিমাণের চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ থেকে ১৪ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মডেলের মোট ৪৫ হাজার ৬৪টি ওয়াশিং মেশিন আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এর মধ্যে ২০২০ সালে ১০ হাজার ৮১৭টি, ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৫২২টি, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ৪৬১টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬৪টি আমদানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ২০২৫ সালে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, স্থানীয় উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি করা হলে, তা সরকারের শিল্প নীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব পণ্যের আমদানিতে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কী হারে শুল্ককর পরিশোধ করা হয়েছে, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালবেলাকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকারী হিসেবে শুল্ককর সুবিধা নিয়ে একই সঙ্গে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করলে প্রকৃত উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়বেন। তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে। বিপরীতে একই সুবিধা নিয়ে তৈরি পণ্য আমদানি করা হলে তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে। এতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তারা হায়ার বাংলাদেশের বিল অব এন্ট্রি, আমদানি তথ্য, আইআরসি, উৎপাদন লাইন, কারখানার সক্ষমতা এবং এসআরওর আওতায় নেওয়া সুবিধা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে দেওয়া নীতি-সুবিধা যদি সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সরকারের শিল্প নীতির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় ও ন্যায্য প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি অনুমান বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়; আমদানি নথি, উৎপাদন রেকর্ড, কারখানার সক্ষমতা এবং রেয়াতি সুবিধার শর্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য কালবেলাকে বলেন, দেশে শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বাড়াতে সরকার এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা দিচ্ছে। এর প্রধান শর্ত স্থানীয়ভাবে ফিনিশড গুডস উৎপাদন। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এসআরওর শর্ত ভেঙে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির নামে ফিনিশড গুডস আমদানি করে সুবিধা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হায়ার বাংলাদেশ এমন সুবিধা নিয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। ফিনিশড গুডসকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট বিষয়টি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবে।