প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দেশের একমাত্র সরকারি গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান। তবে পাঁচ দশকের বেশি পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কোনো গাড়ি বা যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারেনি। মূলত বিদেশ (বিশেষ করে জাপানের মিৎসুবিশি) থেকে ‘কমপ্লিটলি নকড ডাউন’ অবস্থায় গাড়ি এনে অ্যাসেম্বল বা সংযোজন করে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডলার সংকট মোকাবিলায় সরকার কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করায় লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রগতির পরিচালন ব্যয় বাবদ গুনতে হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, বছরে প্রগতির গাড়ির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজারের ওপরে। সেখানে বছরে ৮০০ থেকে ৯০০ গাড়ি বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি বিক্রি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, সব ধরনের যানবাহন ক্রয় খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ থাকবে। শুধু ১০ বছরের অধিক পুরোনো টিওঅ্যান্ডই-ভুক্ত যানবাহন প্রতিষ্ঠান এবং নবগঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টিওঅ্যান্ডই-ভুক্ত যানবাহন অর্থ বিভাগের অনুমোদনক্রমে ক্রয় করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স এবং নিরাপত্তা কার্যে ব্যবহারের জন্য মোটরযান ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনকৃত বা নতুন ক্রয়কৃত মোটরযান (জিপ/কার) অবশ্যই ইলেকট্রনিক গাড়ি হতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইলেকট্রনিক গাড়ি সংযোজনের দিকে এগোতে পারেনি।
প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন অর্থবছরের কর-পূর্ব নিট মুনাফা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৬.৮৮ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৫.৪৯ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০১.৩৩ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৬.২ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৮.৫ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.২৮ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭২.৬২ কোটি ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক ৯০০টি গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪৮টি গাড়ি বিক্রির রেকর্ড গড়ে। তবে চলতি অর্থবছরে ১ হাজার গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মোট লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশও পূরণ সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, প্রগতির মূল ক্রেতা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্প। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি সুবিধা পেয়েও উন্মুক্ত বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে গাড়ি বিক্রি করার মতো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। দেশীয় বাজারে সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডে ইংল্যান্ডের জেনারেল মোটরসের সহযোগিতায় ‘গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল) নামে বিএসইসির অধীনে আসে। সরকারিভাবে সব ধরনের সহযোগিতা পেলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও প্রগতি সম্পূর্ণভাবে বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল, কারণ তারা নিজেরা কোনো যন্ত্রাংশ তৈরি করে না। প্রতিষ্ঠানটি জাপান (মিৎসুবিশি, নিশান, ইসুজু), ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে যন্ত্রাংশ এনে গাড়ি সংযোজন ও বাজারজাত করে আসছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত ভারী ও মাঝারি আকারের যানবাহন যেমন জিপ, পিকআপ, বাস, মিনিবাস ও অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করলেও সম্প্রতি সেডান কার সংযোজনে প্রবেশ তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে একটি নতুন সংযোজন। সরকারি নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের জন্য গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে প্রগতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। সেডান কার অ্যাসেম্বল করার মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি সেডান কারের বাজার ধরে রাখা।
প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানি মোট ২৬৯টি যানবাহন বিক্রি করতে পেরেছে। গাড়ি ও অন্যান্য সমন্বিত মোট বিক্রি ২৪৮.২১ কোটি টাকা, যা গত বছর ছিল ৪৩২.৮২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে গাড়ি বিক্রিতে প্রায় ৪২.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মোট মুনাফার ক্ষেত্রে গত বছর যেখানে ৮১.৪৪ কোটি টাকা ছিল, সেখানেও এবার ২০.০৫ কোটি টাকা হয়েছে। পণ্য বিক্রয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাসের কারণে প্রতিষ্ঠানের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৩৪.৫৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ছিল ৫৪.৪৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে নিট মুনাফাও হ্রাস পেয়েছে ৩৬.৫৭ শতাংশ। মূল ব্যবসা বা যানবাহন সংযোজন বা বিক্রি থেকে রাজস্ব অর্জনে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
জানা গেছে, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যা এখনো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। নিবন্ধিত কার্যালয় ঢাকার বিএসইসি ভবনে। হেড অফিস চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় এবং কারখানা সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে অবস্থিত। বর্তমানে ৭.২৯ কোটি টাকার কাঁচামাল মজুত আছে (প্রধানত পাজেরো জিপের যন্ত্রাংশ)। ২০২৫ সালের ৩০ জুনে কোম্পানির শোরুম ও কারখানায় ১৫৩টি তৈরি গাড়ি অবিক্রীত অবস্থায় মজুত দেখানো হয়েছে, যার মোট বাজার বা উৎপাদন মূল্য ১৪০.৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০৬টি পাজেরো জিপ, ২৫টি কিয়া সেডান কার, ১৪টি মাহিন্দ্রা পিকআপসহ আরও বেশকিছু গাড়ি রয়েছে।
২০২০ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ৫০ একর জায়গায় জাপানের মিৎসুবিশি, টয়োটা, সুজুকি, ইসুজু প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপসহ বেশকিছু দেশে প্রগতি সংযোজিত গাড়ি রপ্তানি করারও কথা ছিল। তবে দীর্ঘ ছয় বছরেও সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া ঢাকার তেজগাঁওয়ে গাড়ির জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ সার্ভিস সেন্টারসহ ৩৭তলা ভিত্তির ওপর ১৩ তলাবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে। গাড়ি বিক্রির শতকরা ৯৬ শতাংশের বেশি ঢাকায় হলেও এখান প্রগতির নিজস্ব কোনো ওয়ার্কশপ বা সার্ভিস সেন্টার নেই। নতুন করে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ওয়ার্কশপ তৈরি করা হলেও যন্ত্রাংশের কারণে সেটি চালু করা যায়নি।
ব্যাংকে জমানো টাকাই বাঁচাল প্রতিষ্ঠানকে: ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি গাড়ি সংযোজন ও বিক্রি করে পরিচালন মুনাফা করেছে মাত্র ৩.৬২ কোটি টাকা। বিক্রি কমায় আয় কমলেও প্রগতির বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশেষ করে সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকে মোট ৪৯২ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য খাত থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করে। মূলত এই অ-পরিচালন আয়ের ফলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফার বড় ক্ষতি সামলে নিট মুনাফা বজায় রাখতে পেরেছে।
বাজেট ও প্রকৃত খরচের তুলনা: বাজেটে ৬৬০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা নিট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল। প্রকৃত অর্জন হয়েছে ২৪৮ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬২.৪৪ শতাংশ কম। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড শুধু সরকারি সংস্থাগুলোর দিকে নির্ভরশীল হয়ে থাকায় বছরে পর বছর খোলা মার্কেটে গাড়ি বিক্রির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। এখন সরকার গাড়ি কেনা কমিয়ে দেওয়ায় লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি প্রগতি।
নিট মুনাফা বাজেট লক্ষ্যমাত্রা: প্রতিষ্ঠানটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফার লক্ষ্য ছিল ৭৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রকৃত নিট মুনাফা অর্জিত হয়েছে ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৬.১১ শতাংশ কম। গুদামে মজুত পণ্য দ্রুত বিক্রি না হওয়ায় স্থায়ী সম্পদের বিপরীতে আশানুরূপ বিক্রি অর্জিত হয়নি।
উৎপাদন ও পরিচালন খরচ: গাড়ির কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৫৫০ কোটি টাকার বিপরীতে ৩৩১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা (বাজেটের প্রায় ৩৯.৬৮ শতাংশ) অব্যবহৃত থেকে গেছে। দেশের আর্থিক টানাপোড়েন প্রক্রিয়ায় বাস্তবসম্মত বাজার জরিপের অভাব ছিল। বিক্রয় পূর্বাভাস সঠিক না হওয়ায় প্রাক্কলিত বাজেট ও বাস্তব খরচের মধ্যে বড় বৈষম্য তৈরি হয়, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনার নীতিগত দুর্বলতা তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, ২০২২-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৬৬ হাজার ৬২৯টি জিপ, পিকআপ, বাস ও অ্যাম্বুলেন্স নিবন্ধিত হলেও প্রগতি বিক্রি করতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ৭০৭টি গাড়ি। প্রায় সাড়ে তিন বছরে সামগ্রিক বাজারে প্রগতির শেয়ার মাত্র ২.৫৬ শতাংশ। গাড়ির বাজারের ৯৭.৪৪ শতাংশ বেসরকারি আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলোর দখলে চলে গেছে। শতকোটি টাকার অবকাঠামো এবং সরকারি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় প্রগতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
সরকারি সুরক্ষার পরও ধস: সরকারি কর্মকর্তা ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রগতির গাড়ি কেনা বাধ্যতামূলক করা সত্ত্বেও গত সাড়ে তিন বছরে ১ হাজার ৭০৭টির বেশি গাড়ি বিক্রি না হওয়া প্রমাণ করে প্রগতির অ্যাসেম্বল করা গাড়ির তুলনামূলক উচ্চমূল্য, পুরোনো প্রযুক্তি ও মডেলের সীমাবদ্ধতার কারণেই বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ক্রেতা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রগতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৯৬ শতাংশ গেছে কাঁচামাল ক্রয়ে। বিক্রয় মূল্যের বড় অংশই পণ্যের উৎপাদন বা ক্রয় খরচ কাভার করতে চলে যায়। কোম্পানিটি বাজেট অনুযায়ী বিক্রয় ও মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এবং মজুত পণ্য বিক্রির ধীর গতি তৈরি হয়েছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে কোম্পানিতে ইক্যুইটি ও অন্যান্য সঞ্চিতির পরিমাণ ৮৫৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকায়। আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও গাড়ি বিক্রয় কমতে থাকলে এবং ব্যাংক সুদের ওপর ভর করে মুনাফা দেখানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন সক্ষমতা আরও হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকরা।
এসব বিষয়ে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু সাঈম কালবেলাকে বলেন, প্রগতির মূলগ্রাহক সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকারি সিদ্ধান্তে সব ধরনের যানবাহন ক্রয় খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, আগামীতে গাড়ি প্রতিস্থাপন বা নতুন ক্রয়কৃত মোটরযান (জিপ/কার) অবশ্যই ইলেকট্রিক গাড়ি হতে হবে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ইলেকট্রিক ৫০টি যাত্রীবাহী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের অর্ডার দিয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরে ইলেকট্রিক বাসের কার্যক্রম উদ্বোধন হবে।
তিনি আরও বলেন, তেজগাঁওয়ে মিৎসুবিসির অথরাইজ একটি ওয়ার্কশপ বা সার্ভিস সেন্টার তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। মিৎসুবিসির পরিচালনায় গাড়ির যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হবে। ঢাকায় বসে জাপানি সেবা পাবেন প্রগতির গ্রাহকরা।
গাড়ি সংযোজন করাই প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র ভরসা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেলেও ৬৯ বছরে গাড়ির নাট-বোল্টও তৈরি করতে পারেনি। এক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, প্রগতির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ঠিকমতো কাজ করতে না করতেই বদলি হয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, প্রগতি নিজস্ব গাড়ির নাট-বোল্ট তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়ার আগেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। পরবর্তী সময়ে যারা আসেন, তারাও আবার ভিন্ন পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এভাবেই চলছে প্রগতি। সে কারণেই এখন পর্যন্ত গাড়ির নাট-বোল্টও তৈরি করতে পারেনি প্রগতি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান কালবেলাকে বলেন, সরকারি কেনাকাটা বন্ধ হয়নি। তবে সরকারের একটা পলিসি রয়েছে। সরকার ইলেকট্রিক গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে। এরপরও যেসব গাড়ি কেনা দরকার, সেসব কিনছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞের মত: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক কালবেলাকে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘ ৬৯ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও প্রতিষ্ঠানটির গুণগত বা কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। জবাবদিহির অভাব থাকায় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার না হয়েও যুগের পর যুগ একই কায়দায় চলছে। প্রগতির মতো প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
তিনি বলেন, সরকারের সরাসরি ব্যবসায় যুক্ত থাকার বদলে মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করা উচিত। সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত সঠিক নীতিনির্ধারণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করা।
ড. শামসুল হক বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেন আমলারা; আর তারা প্রগতির মতো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করেন। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে কোনো দরপত্রে (টেন্ডার) অংশ নিতে হয় না। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেনাকাটায় তারা সরাসরি গাড়ি বিক্রির আদেশ পেয়ে যায়। ফলে এত বছরেও রাজধানীর বুকে প্রগতি একটি নিজস্ব কার্যকর ওয়ার্কশপ পর্যন্ত চালু করতে পারেনি।
তিনি বলেন, প্রগতিতে কারিগরি দক্ষ জনবল থাকলেও শীর্ষ পদে বসানো হয় আমলাদের, যাদের গাড়ি শিল্পের ওপর কোনো পারদর্শিতা নেই। ফলে দীর্ঘ ৬৯ বছর রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়েও প্রগতি একটি গাড়ির সাধারণ নাট-বোল্ট পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি।