Image description

সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনলে আবারো গণভোটের প্রয়োজন হবে বলে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। তবে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের পক্ষে দাবি জানানো হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি যেন সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে করা হয়। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেন সাংবাদিকরা। গতকাল দুপুর আড়াইটা থেকে দুই ঘণ্টাব্যাপী জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় ৫০ জন সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের পক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। বিশেষ কমিটির তৃৃতীয় এই মতবিনিময় সভার শুরুতে বক্তব্য রাখেন বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের মতামত জানতে চান বিশেষ কমিটি। এ সময় সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনলে গণভোট হবে: সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোট সাধারণত দুই প্রকার। একটা হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট, আরেকটা হচ্ছে আইনের গণভোট। কোন বিষয়ে আইন প্রণীত হলো, সেই হিসেবে জনগণের গণভোটের আহ্বান করা যায়। আর এটা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়। আরেকটা হলো সাংবিধানিক গণভোট। সংবিধানের গণভোটের বাইরে যে আইনি গণভোট হতে পারবে না এরকম কোনো বিধান সংবিধানে নাই। কিন্তু সাংবিধানিক গণভোট আমাদের সংবিধানে আর্টিকেল ১৪২-তে ছিল। আওয়ামী লীগের সময় পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেটা উড়িয়ে দিয়েছে। বাট, এটা ৫ই আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পরে সুপ্রিম কোর্টে একটা ভার্ডিক্ট হয়েছে ফিফটিনথ অ্যামেন্ডমেন্ট যেটা রিপিল করার জন্য চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটা হয়েছে সেখানে জাজমেন্ট এসেছে যে আর্টিকেল ১৪২-এর যে গণভোট সেটা পুনর্বহাল করা হলো। তারপরেও সেটা আমরা কনস্টিটিউশনে... এই আইনসভায় গ্রহণ করতে হবে, এরপরে সেটা কনস্টিটিউশনে প্রপারলি আসবে।

আমরা যদি সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আনি, তাহলে সেটা রেফারেন্ডামে যেতে হবে, জনগণের গণভোট হতে হবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সেটা গণভোটের জন্য দিবেন, এটা হচ্ছে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
তিনি আরও বলেন, ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমি একটা প্রস্তাব করেছিলাম- আরও দুইটা অনুচ্ছেদ যুক্ত করতে হবে। সেটা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি- যেহেতু আমরা একমত হয়েছি, আমরা ধারণ করবো, যেটার জন্য আমরা ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, সেরকম বিধান আর্টিকেল ৫৮(ক) (দুই পরিচ্ছেদ আছে, ক ২ পরিচ্ছেদ আছে), এই জায়গাতে যদি ভবিষ্যতের কোনো পার্লামেন্ট অ্যামেন্ডমেন্ট করে, সেটা অনুমোদনের জন্য যেন গণভোটে যেতে হয়। সেটা এই চারটা বিধানের সঙ্গে এই দুইটাকেও আমরা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একমত হয়েছি। সেটা আমাদের প্রস্তাব ছিল, বিএনপি’র পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল। এগুলোতে তো অবশ্যই গণভোট হতে হবে, এটা বাধ্যতামূলক, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ এবং ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্পাদকদের মধ্যে অনেকেই এই প্রস্তাব দিয়েছেন যে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদেরকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে একটা ঐকমত্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রণয়ন করলে ভালো হবে। তো আমরা তো একমত। আমরা বারবারই তাদেরকে আহ্বান জানিয়েছি, এখনো আহ্বান জানাই। তারা যখনই এই কমিটিতে যোগদান করবেন, আমরা স্বাগত জানাবো। এটা ভালো হতো তারা যদি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। তাহলে আমরা অনেকগুলো বিষয় যেগুলো বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে সেগুলো আমরা ধারণ করতে পারতাম, একোমোডেট করতে পারতাম।

তিনি বলেন, আমরা চাই আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকুক, কোনো বিভক্তি না থাকুক। জুলাই জাতীয় সনদ সম্পূর্ণরূপে আমরা যেভাবে স্বাক্ষরিত করেছি সেভাবে বাস্তবায়ন করবো এবং এর বাইরেও কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেগুলো ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি অথবা পরিহার করা হয়েছে, সেটা আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে আমাদের আরও অনেকগুলো প্রস্তাব আছে যেগুলো গ্রহণ করতে গেলে সংবিধানে সংশোধনী আসতে হবে, সেগুলোও আমরা ধারণ করবো।
ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন সংসদে জমা দেয়ার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি যাতে ডিসেম্বরের ভিতরে রিপোর্টটা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতে পারি। সেই ক্ষেত্রে এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে এটা আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর পক্ষ থেকে একটা বিল আসবে। তো সেজন্য আমি আশা করি যে, জানুয়ারির সেশনে যেটা বছরের প্রথম অধিবেশন হবে, সেই সেশনে বিলটা আসতে পারে।

ওই বিলের পরেই কি গণভোটে যাচ্ছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিলের পরে তো সংবিধান সংশোধনীর জন্য একটা প্রক্রিয়া আছে। সংবিধানের সংশোধনীর ক্ষেত্রে আলোচনা হবে বিলের উপরে, তারপরে সেটার উপরে অ্যামেন্ডমেন্ট থাকলে অ্যামেন্ডমেন্ট নিয়ে আলোচনা হবে, বিরোধিতা থাকলে সেটা নিয়ে আলোচনা হবে। তারপরে সেই সংশোধনী যদি থাকে সেগুলো গৃহীত হওয়ার জন্য সাংবিধানিক পার্লামেন্টারি রুলস অব প্রসিডিউর অনুসারে সেটা আমরা যাবো। তারপরে যদি এটা পাশ হয়, সংশোধনী গৃহীত হয়, তখন সেটাতে যে আর্টিকেলগুলোতে চেঞ্জ আসলে গণভোট হওয়ার কথা, সেটা গণভোট হবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে। আমি ধারণা দিতে পারি আপনাদের, এবার সেরকম আর্টিকেলগুলোতে পরিবর্তন আসবে, প্রস্তাবনাতে পরিবর্তন আসবে। তো সুতরাং এটা গণভোটে যাওয়ার কথা।
কবে নাগাদ গণভোট হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগে সংশোধনী পাশ হোক, তারপরে গণভোট হবে। আর গণভোটটা হলে, পক্ষে যদি ভোট দেয় জনগণ, সেটা পাশ হয়েছে। তখন রাষ্ট্রপতি সেটা স্বাক্ষর করবেন। তখন সেটা আইনে পরিণত হয়ে গেল।

নির্বাচনী মেনিফেস্টো নাকি জুলাই সনদ- কোনটি বেশি অগ্রাধিকার পাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে প্রায়োরিটি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে যে বিষয়গুলো আমরা উল্লেখ করে ম্যান্ডেট পেয়েছি সেগুলোও ধারণ করবো। এখানে মহান আল্লাহর উপর দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস, এটা সংবিধানের প্রস্তাবনায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ধারণ করেছিলেন এবং একই বিষয়টা রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে আর্টিকেল ৮-এ ধারণ করেছিলেন। এগুলো আমরা বলেছি এগুলো আমাদের প্রতিশ্রুতি, এগুলো আমাদের ইশতেহারে আছে। এই বিষয়গুলোতে আজকে যারা বিরোধী দল, তারাও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে একমত পোষণ করেছিলেন। কোনো না কোনো কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এই বিষয়গুলো সর্বসম্মতক্রমে আসে নাই বিধায় হয়তো অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি। কিন্তু আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে। এখানে বিরোধী দলও একমত।

জাতীয় ঐকমত্যে জোর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের: এদিকে দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের জানান, সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি যেন একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়, সে বিষয়ে সবাই জোর দিয়েছেন। বিরোধী দল এখনো কমিটিতে তাদের জন্য নির্ধারিত ৫ জন সদস্য দেয়নি এবং বিরোধিতা করছে। তবে কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কমিটিতে যুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তারা কমিটিতে না এলেও, সংসদে যখন প্রস্তাবটি যাবে তখন তারা সহযোগিতা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হবে এবং তা পাশ হবে বলে কমিটি আশাবাদী।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে প্রধানমন্ত্রীকে যে একচ্ছত্র ও বিশাল ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, তা রাষ্ট্র বা জাতির জন্য কল্যাণকর হয়নি বলে মত দেয়া হয়। তাই প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাংবাদিকরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানো দাবি তুলেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এটি আর কেউ বাতিল করার সুযোগ না পায়, সেজন্য সংবিধানে বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
ফের গণভোটের বিষয়ে মুস্তাফিজ শফি বলেন, সংবিধানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে হলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী পুনরায় গণভোটের (জবভবৎবহফঁস) প্রয়োজন হতে পারে বলে সভায় আলোচনা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান নিশ্চিত করেছেন যে, মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটে যাওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া সাম্প্রতিক গণভোট বা ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের বাস্তবায়ন নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়- ওই গণভোটটি মূলত প্রক্রিয়াগত ছিল। সরকার ওই গণভোটের অধ্যাদেশটি পাশ না করলেও, গণভোটের মূল চেতনা এবং সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চান (কিছু নির্দিষ্ট দ্বিমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদে)।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।