Image description

দেশের বিভিন্ন অনলাইন ই-বুক শপে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ওসামা বিন লাদেনের জীবনী নিয়ে লেখা বই বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আল কায়দা ও আইএস’র সঙ্গে সরাসরি জড়িত লেখকদের শত শত বই অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এসব বইয়ের বেচা-বিক্রিও হচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার দিলেই কুরিয়ারে পাঠকের বাসায় বই পৌঁছে দেয়া হয়। কিছু কিছু ই-বুক শপ থেকে আবার ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে টাকা নিয়ে পিডিএফ আকারে বই সংগ্রহ করা যাচ্ছে। শুধু অনলাইন, কুরিয়ারে নয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী বইমেলায়ও এই বই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। লম্বা লাইন ধরে পাঠকরা এসব কিনে নিচ্ছেন।

বিক্রি বেশি হওয়ায় প্রায় প্রতিটি স্টলেই এসব বই পাওয়া যাচ্ছে। কোনো নজরদারি ছাড়াই আল-কায়দার নেতা ও তাদের অনুসারীদের লেখা বই বেচা-বিক্রি চলছে। এদিকে অনলাইনে উগ্রবাদী বই বিক্রিতে শীর্ষে রয়েছে ওয়াফিলাইফ নামের একটি ই-বুক পাবলিকেশন। প্রতিষ্ঠানটি মহাখালী ডিওএইচএসে বসে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০১৫ সালে ওয়াফিলাইফ প্রথমে অনলাইন বই বিক্রির প্ল্যাটফরম হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এটি তৈরি করেন তাদেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান ওয়াফি সলিউশন।

তবে ১০ বছর তারা বিভিন্ন একাডেমিক, শিশু-কিশোর, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিজ্ঞানপ্রযুক্তি, মোটিভেশনাল, ভর্তি প্রস্তুতি, চাকরি প্রস্তুতি, আউটসোর্সিং, আরবি বই বিক্রি করলেও গত ৫ই আগস্টের পর ওসামা বিন লাদেন এবং তার অনুসারীদের বই অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ওয়াফিলাইফের নিজস্ব পাবলিকেশন থাকলেও তারা বাংলাবাজারের প্রজন্ম পাবলিকেশনের মাধ্যমে বাংলায় অনুবাদ করা লাদেন ও উগ্রবাদী লেখকদের বই ছাপায়। বিক্রি বেশি হওয়ায় বাজার ধরতে বর্তমানে বইগুলো বাংলাবাজারের আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনায় প্রকাশ্যে ছাপা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার অর্ডার দিয়ে ফকিরাপুল থেকে ছাপিয়ে নিচ্ছেন।

এদিকে ওয়াফিলাইফের সাইট খুঁজে এমন কয়েকটি বই পাওয়া গেছে, যা অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছে পাওয়া গেছে। বইগুলো উগ্রবাদী বই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিছু ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদা নিয়ে লেখা হয়েছে। আবার কিছু বইয়ের লেখক বা বিষয় উগ্রবাদী মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, তাদের ওয়াফিলাইফ স্টাইল নামে আশুলিয়ায় একটি মিনি গার্মেন্টসও রয়েছে। যেখানে টুব্বা, টুপি, পাঞ্জাবি বানানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যক্রম পরিচালিত হয় আশুলিয়া গাজিরচটের একটি মাদ্রাসা থেকে। প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন রুবায়েত আসিরুল বারী।

যেসব বই পাওয়া যাচ্ছে: ‘শহীদের মর্যাদা চল্লিশ হাদিস’ বইটির লেখক আবু ইয়াহইয়া আল-লিবি। বাইটি ওয়াফিলাইফের সাইটে সরাসরি আবু ইয়াহইয়া আল-লিবির নামে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত। আবু ইয়াহইয়া আল-লিবি আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রচারক ছিলেন। মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের নথিতে তাকে আল-কায়েদার কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য প্রচারণামূলক বার্তা প্রচারকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বুক শপে তালিকায় রয়েছে, ‘মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা করা ঈমান আনার পর প্রথম ফরজ’ এই বইটির লেখক আবদুল্লাহ আযযাম। বইটি সরাসরি জিহাদি মতাদর্শ প্রচারের উপাদান রয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে প্রচারে শীর্ষে রয়েছে ‘আফগান রণাঙ্গনে’ বইটি।

এই বইয়ের লেখক আবদুল্লাহ আযযাম। পুরো বইতে আফগান যুদ্ধে তালেবানের বীরত্বগাথা ও যুদ্ধকে জিহাদ হিসেবে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আফগান যুদ্ধের গল্প নিয়ে লেখা বই ‘কারা জান্নাতি কুমারীদের ভালোবাসে’ বইও পাওয়া যাচ্ছে। এই বইটির লেখক আবদুল্লাহ আযযাম। বইটি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ পেয়েছে- যেখানে আফগান শহীদ, শাহাদতের নেশা, জিহাদ স্পৃহা এবং বাংলাদেশের একটি জিহাদি কমান্ডারের প্রশংসা করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘বেদ্বীনদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বাহাদুর ওসামা বিন লাদেন’ অনলাইন বুক শপ ওয়াইফিলাইফে মুসলিম ব্যক্তিত্ব ক্যাটাগরিতে বইটি বিক্রির বিজ্ঞাপন চলছে।

বইটির বিবরণে আল-কায়েদা, আফগান যুদ্ধ ও ৯/১১ নিয়ে আলোচনা থাকার কথা বলা হয়েছে। পুলিশের নথিতে এটাকে উগ্রবাদী বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে আফগান নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে লেখা ‘দ্য মাস্টারমাইন্ড’ বইটি তাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, আইএস’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবদুল্লাহ আযযামের ৩৫টি বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ বই জিহাদি ভাবধারায় লেখা। আবদুল্লাহ আযযামের ছিলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত একজন ইসলামী আলেম ও জিহাদি মতাদর্শের গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে জিহাদ হিসেবে প্রচার ও বিদেশি যোদ্ধাদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।

তিনি ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরামর্শদাতা ছিলেন। তার লেখালেখি পরবর্তী জিহাদি আন্দোলনের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। এছাড়া ‘নেদায়ে তাওহিদ’- বইটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে জিহাদী বই হিসেবে উল্লেখ আছে। র‍্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন ২০২২ সালে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের গ্রেপ্তারের সময় ‘নেদায়ে তাওহীদ’-এর ৪টি কপি উদ্ধার করে। বইটিকে সরাসরি উগ্রবাদী বই হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এমনকি একটি জিহাদি প্রচারণামূলক ওয়েবসাইটে বইটিকে ‘জঙ্গিবাদের উপর লিখিত দিক-নির্দেশনামূলক কিতাব’ বলা হয়। এবং আল-কায়েদা সম্পর্কে আলোচনা থাকার দাবি করে বইটি ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান করা হয়। এছাড়া আল-কায়েদা নেতা লাদেনের ‘ওসামার সঙ্গে আমার জীবন, দ্য কিলিং অব ওসামা, দ্য রোড টু আল-কায়েদা, আওঙ্গেজেব: বিতর্কের অন্তরালে, কান্দাহারের পথে, দ্য সিক্রেট ওয়ার ইন অফগানিস্তান, কান্দাহারের ডায়েরি, কয়েদি ৩৪৫, অ্যাম্বাসেডর, দ্য লেডি অব বাগরাম, জেগে ওঠো হে উম্মাহ্‌, সত্যের সন্ধানে হে যুবক, মরণজয়ী মুজাহিদ, জিহাদ সন্ত্রাস না রহমত, গজওয়াতুল হিন্দ, যুদ্ধ মালহামা বইগুলো অনলাইনে অফলাইনে হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে।

এসব বইয়ের অধিকাংশই আর-রিহাব উসামা বিন লাদেন, আইমান আল জাওয়াহিরি, আসেম ওমর, মোল্লা দাদুল্লাহ, শাইখ ইউসুফ আল-উয়াইরি, আবু উসামা, আসিম আল বারকাওয়ি ওরফে আবু মুহাম্মাদ মাকদিসি, আহমাদ ফারুকের মতো আল-কায়েদার প্রথম সারির নেতাদের লেখা।

কারা বিক্রি করছেন এসব বই: পুলিশের দেয়া তথ্য বলছে, অতিতে উগ্রবাদী বই বিক্রি ও ছাপা কাজে জড়িত থাকায় কিছু প্রকাশনী মালিকদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর তাদের অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে আবারো জিহাদি মতাদর্শের বই বিক্রির কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। অনলাইন অফলাইন দুই জায়গায়ই আল- কায়েদা ও আইএস নেতাদের বই বিক্রিতে জড়িত রয়েছেন। অনলাইন ঘেঁটে আইএস সংশ্লিষ্ট লেখকদের বই বিক্রির আরও কিছু ই-বুক শপ ও পাবলিকেশনের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একটি আর-রিহাব পাবলিকেশন্স। বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আর-রিহাব পাবলিকেশনের প্রকাশনা। এর স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুর রহমান শামীম।

তিনি আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানীর বইগুলো প্রকাশের দায়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হন। বর্তমানে তিনি আল-কায়েদার নেতাদের বই ছাপাচ্ছেন। আরেকটি ইলমহাউস পাবলিকেশন্স। ইলমহাউস পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী আসিফ আদনান। ২০১৪ সালে ডিবি তাকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। তার প্রকাশনীতে বিন লাদেনের অনুসারী এবং আইএস-এ কাজ করেছেন এমন লেখকদের বই রয়েছে। বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারে সিয়ান পাবলিকেশনের প্রকাশনা অফিস। এর স্বত্বাধিকারী আবু তাসমিয়া আহমদ রফিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে জানা যায়, তিনি একসময় ‘জামায়াতুল মুসলিমিন’ নামের একটি গোষ্ঠীর সমন্বয়ক ছিলেন। জঙ্গিবাদের অভিযোগে তিনি ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হন।

৭ মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। সম্প্রতি তার প্রকাশনায়ও জিহাদি বই বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া কওমি মার্কেট এলাকার খান প্রকাশনী, বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের রুহামা পাবলিকেশন, অন্যান্য প্রকাশনী, পি কে রায় রোডে ‘সন্দীপন প্রকাশনীতেও উগ্রবাদী সংশ্লিষ্ট বই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। আর-রিহাব ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে লেখা মোল্লা দাদুল্লাহর ‘সত্যের সন্ধানে সেই যুবক’, আয়মান আল-জাওয়াহিরির ‘আমার দেখা শাইখ ওসামা’, আনওয়ার আল-আওলাকির ‘নবীদের জীবন কাহিনী’, আসেম ওমরের ‘দাজ্জাল: কালো পতাকার চূড়ান্ত শত্রু’ ও ‘দু’টি জীবন ব্যবস্থার লড়াই: ইসলাম ও গণতন্ত্র’, ইউসুফ আল-উয়াইরি ও আনওয়ার আল-আওলাকির যৌথভাবে লেখা ‘আল্লাহ্‌র পথে যা কিছু অপরিবর্তনীয়’ প্রকাশ করেছে। এসব বইয়ের অধিকাংশের অনুবাদক, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন আরিফ মাহমুদ।

জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, এই বিষয়টি আমরা অবগত। এটা নিয়ে কাজ করতে সাইবারের ডিসিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।