Image description

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আবারো তিনজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। গত মঙ্গলবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে তারা। এ নিয়ে উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে। অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুবাহিত রোগ। আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস, চামড়া বা মৃতদেহের সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হতে পারে। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। সুন্দরগঞ্জ ছাড়াও সম্প্রতি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়েছে। এ ছাড়া রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলায় এবং দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুই মাস আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স দেখা দিয়েছিল। গত দুই মাসে পাঁচ জেলায় শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং আইইডিসিআর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ শনাক্তে শুধু পাঁচ জেলা নয়, দেশের সব জেলাতেই সার্ভিলেন্স কার্যক্রম চালু রয়েছে। কোনো এলাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আইইডিসিআরের টিম সেখানে গিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা, সংক্রমণের ধরন ও করণীয় বিষয়ে পরিস্থিতি যাচাই করে। বর্তমানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও আইইডিসিআরের একটি দল কাজ করছে।

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, ঘোড়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীগুলোকে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। টিকাদান নিশ্চিত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি পশুর মালিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে নিয়মিত টিকা দেওয়ার। আক্রান্ত পশুকে হাটবাজার বা অন্য কোথাও নেওয়া যাবে না। কোনো পশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনা না করে নির্ধারিত নিয়মে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। রংপুরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, ‘এটিকে ‘হাব’ না বলে ‘ক্লাস্টার’ বলা যায়। অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাটিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। ফলে কোনো এলাকায় একবার সংক্রমণ দেখা দিলে পরবর্তী সময়েও সেখানে আবার সংক্রমণের ঘটনা ঘটতে পারে। উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি দেখা যায় এবং এবার রংপুর জোনেও সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে শনাক্ত হওয়া তিনজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিলে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার রোধে আক্রান্ত পশু জবাই ও মাংস বিক্রি না করা, অসুস্থ বা মৃত পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামরুল হাসান বলেন, অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ নিয়ে উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের পশ্চিম বাছোহাটি গ্রামের তিনজন, পূর্ব বাছোহাটি গ্রামের ২৬ জন, রামজীবন ইউনিয়নের বাজারপাড়া গ্রামের তিনজন, দহবন্দ ইউনিয়নের বামনজল গ্রামের একজন ও সোনারায় ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামের একজনসহ মোট ৩৪ রোগী জরুরি বিভাগে এসেছিলেন। তাদের সবাইকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কের কিছু নেই। চিকিৎসায় এ রোগ ভালো হয় বলে জানান তিনি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত ২০ হাজার পশুর ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো পেয়ে যাব।’

আগে কোন কোন জেলায় শনাক্ত হয়েছে : দেশে অ্যানথ্রাক্স নতুন কোনো রোগ নয়। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, এটি দেশের বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের একটি স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান রোগ। ২০১৯ সালে আগের প্রাদুর্ভাবের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল ও রাজশাহী-এই পাঁচ জেলার ৯টি উপজেলায় সক্রিয় নজরদারি শুরু করা হয়।

আইইডিসিআরের নজরদারি তথ্য অনুযায়ী মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে অ্যানথ্রাক্সের রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ২০২২ সালে পরীক্ষায় শনাক্ত ৬২টি নমুনার ৬১টিই গাংনী থেকে এবং একটি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থেকে ছিল। ২০২৩ সালে পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ৭৮টি পজিটিভ হয় এবং সবগুলোই গাংনী উপজেলার। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ২০২২ সালে একটি পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে রুগ্্ণ গরুর মাংসের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১৫ জনের অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরাতেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের রোগী শনাক্তের খবর আসে। ২০২৫ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। এ ছাড়া আইইডিসিআর বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় ধারাবাহিকভাবে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগ। রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আবদুল হাই সরকার বলেন, অ্যানথাক্সের কারণে যাদের শরীরে ঘা দেখা দিয়েছিল তারা এখন সুস্থ।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স। চলতি বছরের গত ৯ মাসে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় ৩২৬ জন। আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সময় মানুষের শরীরে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, আগস্ট মাসে উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৩৮ জন শনাক্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে শনাক্ত হয়েছে ১৮ জন। আক্রান্তরা মূলত রুগ্্ণ ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়ার কারণে সংক্রমিত হয়েছেন। তবে তাদের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি।

চিকিৎসক ডা. বিডি দাস বলেন, তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স হয়ে থাকে। এর মধ্যে এ এলাকায় কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন জানান, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানানো এবং আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ ও নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন, কুষ্টিয়ায় নতুন করে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের তথ্য নেই। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, জেলায় সারা বছরই এ রোগে আক্রান্ত দুই-একজন রোগী হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন।