জুলাই গণ অভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন অধরা রয়ে গেছেন। এর মধ্যে নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ জনের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যই এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারাগারের সার্ভার, ডেটাবেস ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করতে হিমশিম কারা কর্তৃপক্ষ। পলাতকদের মধ্যে তিনজন জঙ্গি রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের অবস্থানও এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এখনো নরসিংদী থেকে লুট হওয়া ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারা সূত্র বলছে, বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বেশির ভাগই বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামি। পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তাদের তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিশেষ ইউনিট কাজ করছে। তারা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। পলাতকদের ধরতে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।
তবে পলাতক বন্দির সংখ্যার পাশাপাশি নরসিংদীতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি। স্থানীয় কারা ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় বিপুলসংখ্যক বন্দি পালিয়ে যান। একই সময় কারাগারের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়।
নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার তারেক কামাল জানান, ওই সময় পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ বন্দির মধ্যে ৪৮৬ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ১৭৩ জনকে। এখনো ১৬৭ জন পলাতক রয়েছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অগ্নিসংযোগে নথিপত্র পুড়ে যাওয়ায় বন্দিদের জামিন, সাজা ও মামলার তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আদালত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
নরসিংদী জেলা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, কারাগার থেকে লুট হওয়া ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৫৮টি উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৬৯৮ রাউন্ড গুলি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আশিকুর রহমান বলেন, পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ বাইরে থাকার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নরসিংদীর চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও সহিংসতায় কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
নরসিংদী কোর্টের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) জহিরুল হক জুয়েল বলেন, অপরাধীরাও বাইরে, অস্ত্রও বাইরে, এটা আতঙ্কের ব্যাপার। এসব অস্ত্র ছিনতাই, রাহাজানি ও খুনের মতো অপরাধে ব্যবহার হতে পারে। দ্রুত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হালদার দাশ বলেন, কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দেরি হলে এগুলো অপরাধীদের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকেও পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বড় একটি অংশ এখনো অধরা। কারা অধিদপ্তরের জেলার (লজিস্টিক ও মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ওই কারাগার থেকে ২০২ বন্দি পালিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো পলাতক ১২৮ জন। পলাতকদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত, জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। বিদ্রোহের সময় বন্দিরা কারাগারের দেয়াল ভেঙে ও টপকে পালানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন জেলার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান পলাতক ২০২ জন বন্দিকে আসামি করে গাজীপুর কোনাবাড়ী থানায় মামলা করেছিলেন।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ বন্দির পরিচয় শনাক্ত করতে না পারার বিষয়টি পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাধারণত কোনো বন্দি কারাগারে থাকলে তার নাম, ঠিকানা, মামলা, সাজা, আদালতের তথ্যসহ বিভিন্ন নথি সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু হামলা ও অগ্নিসংযোগে সেই নথির একটি বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। এসব তথ্য পুনরুদ্ধারে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতের সহায়তা নিচ্ছে। বিভিন্ন মামলার নথি, জামিনের তথ্য ও সাজা-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে পলাতকদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও অনুসন্ধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়াও কঠিন।