Image description

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে অন্তত ৯৬টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৪। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রচারিত অপতথ্য ও গুজবের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এদিকে একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরাসরি নিশানা বানিয়ে ২১টি সুনির্দিষ্ট ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা নিরপেক্ষ ফ্যাক্টচেকিংয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রমাণিত হয়। ‘রিউমার স্ক্যানার’সহ তথ্য যাচাইকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু সেনাবাহিনী নয়, সামগ্রিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনীকে ঘিরে ছড়ানো অপপ্রচারের এই হার বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে নিয়ে বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর পোস্ট ও কন্টেন্ট প্রকাশ করা হয় ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে ও সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করাই এসব অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য। মনগড়া তথ্য জুড়ে দিয়ে তৈরি করা নানা ‘কন্টেন্ট’ বা পোস্ট কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ বা সাময়িক অপচেষ্টা নয় বরং এসব সুসংগঠিত তৎপরতা বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিকমাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে নিশানা করে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পোস্ট ও ‘কনটেন্ট’ ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয়ের বীজ বুনছে সংঘবদ্ধ চক্র। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকল ছবি তৈরি এবং অসত্য বা খণ্ডিত তথ্য দিয়ে চমকপ্রদ ‘স্ক্রিপ্ট’ সাজাচ্ছেন তারা, যা পরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। এতে মুহূর্তের মধ্যেই ওইসব ভিডিও বা পোস্ট পৌঁছে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে। এর ফলে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন এক শ্রেণির সাধারণ মানুষ। 

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে তার একটিরও সত্যতা নেই। সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও মানুষের কাছে অজনপ্রিয় করতে এসব করা হচ্ছে। এসবের কোনো ভিত্তি নেই। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল করার যে চেষ্টা তা কখনো সফল হবে বলে মনে করি না। অতীতেও নানা ধরনের চেষ্টা হয়েছে, সেগুলোও ব্যর্থ হয়েছে।’ 

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালের সামগ্রিক ডিজিটাল চিত্র পর্যালোচনায় রিউমর স্ক্যানার দেশজুড়ে মোট ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রচারণার পাশাপাশি বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর উপাদানও বিদ্যমান ছিল। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় সব ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত আপলোড হওয়া তথ্যের একটি বড় অংশই ফরেনসিক বিশ্লেষণে মিথ্যা অথবা বিকৃত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মভিত্তিক উপাত্তে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ৮২২টি অপতথ্য ফেসবুকে, ৬০০টি টিকটকে, ৫৬২টি ইনস্টাগ্রাম এবং ২৪৫টি ইউটিউবে ছড়িয়েছে।

সেনাপ্রধান বা সামরিক বাহিনীর সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে তৈরি একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা দ্রুততার সঙ্গে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ছড়ানোর ফলে অতি অল্প সময়েই তা বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার মোকাবিলা কীভাবে এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যাদের ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আইনশৃঙ্খলা বা জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত তাদের নিয়ে অপ্রপচার গুরুতর অপরাধ বলে মনে করি। সমাজ ও দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।