চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১- জবানবন্দি দিয়েছেন পেশায় গ্রিল মিস্ত্রি এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির গেজেটেড জুলাই যোদ্ধা মো. নবী হোসেন সজিব। জবানবন্দিতে সজিব ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি, হতাহত এবং নিজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, তাঁর শরীরে এখনো প্রায় ১৫০টি পেলেট রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি পেলেট চিকিৎসার সময় বের করা হলেও পিঠের হাড়ের মধ্যে একটি পেলেট রয়ে গেছে, যা বের করা সম্ভব হয়নি। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি ট্রাইব্যুনালে নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্নও দেখান।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন সজিব। মামলার অভিযোগের বিষয়ে প্রসিকিউশনের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশে রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের উসকানি দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪-দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হিসেবে তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন।
তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ। মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমানে তারা কারাগারে আছেন। সাক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা তুলে ধরে নবী হোসেন সজিব বলেন, ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মেরুল বাড্ডায় আমার বাসার কাছেই অবস্থিত। ওই দিন পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সেখানে এসে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই সরাসরি গুলি করতে থাকে।’ তিনি বলেন, ওই গুলিতে উত্তর বাড্ডায় একজন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একজন এবং মধ্য বাড্ডা ইউটার্নের সামনে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ছাড়া অনেক মানুষ আহত হন।
সজিব বলেন, ‘ছাত্র ভাইদের সঙ্গে হাতে হাত রেখে গুলিবিদ্ধ কাউকে রিকশায়, কাউকে ভ্যানে তুলে দিয়েছি। রাস্তায় অনেক রক্ত দেখে আমার বমি আসে। এ কারণে আমি বাসায় চলে যাই।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রামপুরার দিকে অগ্রসর হন। টিভি সেন্টারের সামনে মেইন রোড থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ওই ঘটনায় দুজন নিহত এবং অনেকে আহত হন। সজিব বলেন, ‘তখন ছাত্রদের সহযোগিতায় কাউকে রিকশায়, কাউকে ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমি বাসায় চলে যাই।’
জবানবন্দিতে ৫ আগস্টের ঘটনারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন সজিব। তিনি বলেন, ওই দিন মেরুল বাড্ডার ১৫ নম্বর সড়কে আন্দোলনে যোগ দেন। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা মেইন রোডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সজিব বলেন, ‘পুলিশ মেইন রোড ঘিরে রেখেছিল। তবুও আমরা মেইন রোডে যাই। ওই সময় আন্দোলন চলাকালে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও র্যাবের লোকজন এসে আমাদের ওপর গুলি বর্ষণ করে।’
তার দাবি, ওই গুলিতে তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। একই ঘটনায় আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। নিজের শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে সজিব বলেন, ‘আমার শরীরে প্রায় ১৫০টি পেলেট আছে।’
সজিব জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে কুর্মিটোলা ও ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তিনি বলেন, ‘সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসক আমার শরীর থেকে ২৫টি পেলেট বের করেন। আমার পিঠের হাড়ের মধ্যে একটি পেলেট আছে, যা বের করা সম্ভব নয়।’
সাক্ষ্যে নিজের চোখে দেখা হত্যাকাণ্ড, আহতদের উদ্ধার এবং হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনাগুলো তুলে ধরে সজিব বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তার শরীরে এখনো সেই গুলির ক্ষত ও পেলেটের চিহ্ন বহন করছেন। জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে সজিব এসব ঘটনার জন্য রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে দায়ী করে বিচার দাবি করেন।