Image description

সাইবার সুরক্ষা আইনের (সিএসএ) বেশ কিছু সংশোধনীর খসড়া করা হয়েছে। সেসব নিয়ে অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রেক্ষিতে সংশোধনীর বেশ কিছু ধারা এখন আলোচনার শীর্ষে। এসব ধারা ও শাস্তি যদি বিলের চূড়ান্ত সংশোধনীতে স্থান পায় ও সংসদে তা পাস হয় তাহলে সাইবার জগতের অপরাধ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মতপ্রকাশে হয়রানির শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

আশঙ্কা রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপেরও। সংশ্লিষ্টরা জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে মঙ্গলবার রাতে সংশোধনীর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনের আওতাভুক্ত বেশ কিছু অপরাধ ভ্রাম্যমাণ আদালতে (মোবাইল কোর্ট) বিচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট প্রকাশ, অপমান ও বুলিংয়ের মতো অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত শাস্তি দিতে পারবে। তবে ভুক্তভোগী নারী বা শিশু হলে ওই অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে করতে হবে। 

গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর পাশাপাশি হ্যাকিং, সাইবার সন্ত্রাস, ডিজিটাল চুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় অবৈধ প্রবেশের মতো অপরাধের বিচারও সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে। আরেকটি প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করার জন্য অনুরোধ জানানোর ক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমান আইনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মহাপরিচালকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) কোনো কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ করতে পারে। বর্তমানে কোনো কনটেন্ট দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে তা ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। 

একইভাবে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কিংবা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে সহিংসতায় উসকানি দেয় এমন কনটেন্ট এবং বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেওয়া কনটেন্টও ব্লক করা যায়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার অনুমোদিত অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীকেও কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ জানানোর ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সাইবার নিরাপত্তা আইনে কোনো কনটেন্ট ব্লক করা হলে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

আরেকটি প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই আইনের অধীনে অপরাধ করলে তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। প্রয়োজনে ওই কোম্পানির কার্যক্রমও স্থগিত করা যাবে। বর্তমান আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই। প্রস্তাবিত আইনে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকেও অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো সংবাদমাধ্যম আইন লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করলে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও আদালতকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইনটির সংশোধনী প্রসঙ্গে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) এবং এর প্রস্তাবিত সংশোধনী বা খসড়ার বিষয়ে সমালোচকদের প্রধান আশঙ্কা হলো, বাতিল হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)’-এর বিতর্কিত ও কঠোর ধারাগুলো পুরোপুরি দূর না করে, ভিন্ন নামে বা ভিন্ন আঙ্গিকে এই আইনে রেখে দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে সাংবাদিক, লেখক এবং সাধারণ নাগরিকরা অনলাইনে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে যাবে। তিনি বলেন, আইনের কিছু ধারায় অপরাধকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তা অস্পষ্ট এবং এর অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার বা তল্লাশির ক্ষমতা এবং কিছু ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে এমনটা বলা হচ্ছে। এই উদ্বেগের জায়গাগুলো দূর না করলে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলে আগের আইনের ছায়া হিসেবেই আইনটি বিবেচিত হতে পারে।

একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মত প্রকাশের তো একটা লিমিট থাকবে। দেখা যাচ্ছে যে, এই ধরনের ঘটনার কারণে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আইনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এই সমস্ত চিন্তাভাবনা করে হয়তো সরকার আইনটির সংশোধনীতে নানা ধারা নিয়ে ভাবছে। তবে এটা মত প্রকাশ বা সাংবাদিকদের লেখালেখির ওপরে যেন কোনো হস্তক্ষেপ সৃষ্টি না হয় সেই ব্যাপারটায় অবশ্যই সচেতন থাকা দরকার।

এদিকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৈরি হওয়া এই আইনটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। আইনটির সংশোধনী প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা একটা কুখ্যাত কালো আইনকে রিপ্লেইস (পরিবর্তন) করে আন্তর্জাতিক মানের ভালো আইন দিয়ে এসেছি। সোসাইটি থেকে সামান্য ধন্যবাদটুকুও পাইনি। লেট আওয়ার সোসাইটি ডিল উইথ ইট।’

এর আগে খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ এ এমন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাক্-স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, অংশীজনদের মতামত ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি ঢেলে সাজাবার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয় একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)-২০২৩ রহিত করে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ নামে পাস হলেও তখন সরকারের দিক থেকে পরবর্তীতে আইনে আরও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী সরকারের দিক থেকে একটি খসড়া প্রস্তুত করে তার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সরকার।