অবশেষে আলোর মুখ দেখছে কওমি মতাদর্শী সাত দলের নতুন জোট। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমিরের নেওয়া এ উদ্যোগ শুরুতে থমকে গেলেও দেশের শীর্ষ কওমি আলেমদের মধ্যস্থতায় তা পায় পূর্ণগতি। এক ছাতার নিয়ে আসতে যাওয়া প্রায় সব দল জামায়াত জোটের বাইরে গিয়ে পৃথক জোট গঠন, আকিদার ওপর অটল থাকাসহ তিনটি বিষয়ে অভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়েছে। দলগুলোর প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই আগামী সপ্তাহে নতুন জোট ও চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা হচ্ছে।
হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, হেফাজতে ইসলামের আমিরের উদ্যোগে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জোটের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর বাইরে গিয়ে কওমিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এ জোট গঠন নিয়ে সাব কমিটির সদস্যরা কয়েক মাস ধরে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দল থেকে প্রস্তাবনা নিয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর কমিটি রূপরেখা দলগুলোর সামনে উপস্থাপন করবে।’
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামবাদী বলেন, ‘কওমি মতাদর্শী দলগুলোর দেওয়া প্রস্তাবনাগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বৈঠকের ডাক দিয়েছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বৈঠকে সাত দলের শীর্ষ ৩৫ নেতা ছাড়াও হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নেতা এবং কওমি মুরুব্বিরা উপস্থিত থাকবেন।’
জানা যায়, কওমি মতাদর্শী ইসলামী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে উদ্যোগ নেন শীর্ষ কওমি মুরুব্বি ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১৫ জুলাই ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় বৈঠকে বসে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতারা। ওই বৈঠকে হাটহাজারী মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি জসিম উদ্দিন এবং হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের জোটের খসড়া এবং রূপরেখা পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। শুরুতে এ উদ্যোগ থমকে গেলেও দেশের শীর্ষ ১০ কওমি আলেম জোট প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যুক্ত হন।
তারা প্রত্যেক দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে আকিদাগত বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে রাজি করান। পরে সাব কমিটির কাছে কওমি মতাদর্শী দলগুলো প্রস্তাবনা জমা দেন। এ প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে তিনটি বিষয়ে প্রায় সব দল অভিন্ন মতামত দিয়েছেন। এ প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- কওমি আকিদা এবং বিশ্বাসের ওপর প্রত্যেকে অটল থাকা, জোটবদ্ধ দলগুলো যে কোনো পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং আকিদাগত মতপার্থক্য থাকা জামায়াত জোট থেকে বের হয়ে কওমি মতাদর্শী দলগুলোর পৃথক জোট গঠন করা এবং এ জোটের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অভিন্ন প্রার্থী দেওয়া।
এ ছাড়া দলগুলোর অন্যান্য প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে- অন্য কোনো জোটে না থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সাত দলের ঐক্য এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমন্বয় করা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্য থাকা, সাত দলের ঐক্যে প্রতিটি দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সিদ্ধান্তের অধিকার বজায় রাখার স্বাধীনতা, নতুন ঐক্যে যুক্ত দলগুলো অন্য কোনো জোটে শরিক না হওয়া, সমমনা দলগুলোর ঐক্যের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া, কওমি স্বকীয়তা বজায় রেখে হেফাজতের তত্ত্বাবধানে ঐক্য থাকা অন্যতম।
নতুন জোট গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কওমি মতাদর্শী দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের ঐক্য নিয়ে শুরু থেকে বিরুদ্ধাচরণ করেন শীর্ষ কওমি আলেমরা। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী কওমি মতাদর্শী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিলে, সেই উদ্যোগে যুক্ত হন দেশের আরও ১০ জন শীর্ষ কওমি আলেম। শীর্ষ কওমি আলেমদের মধ্যস্থতায় আকিদাসহ তিনটি বিষয়ে একমত হয় কওমি দলগুলো। আগামী ২৭ তারিখ দলগুলোর চূড়ান্ত রূপরেখা এবং জোটের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে।