Image description

পোশাকশ্রমিকরা নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়নের দাবি তুলছেন। নতুন মজুরি হিসেবে তাঁরা সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা দাবি করছেন। তবে শ্রমিকদের এ দাবিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন পোশাক খাতের মালিকরা। তাঁরা পোশাক মালিকদের সংগঠনের নেতা, নিজেদের সদস্য ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চান। সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সম্প্রতি শ্রম আইন সংশোধন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।

এতে আগামী ডিসেম্বরের আগে মজুরি বোর্ড গঠন করে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময় ঘনিয়ে এলেও এখনো শ্রম বিধিমালার কাজ শেষ হয়নি, যা চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা। আর এটি শেষ না হলে পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়াও শুরু করা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের জন্য আবেদন করেছে।

বর্তমানে কার্যকর সরকারি মজুরিকাঠামো অনুযায়ী গার্মেন্ট শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মোট মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ মজুরিকাঠামোয় মোট চারটি গ্রেড আছে। সর্বোচ্চ গ্রেডে নির্ধারিত মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা চাই। একজন শ্রমিকের বস্তিতে এক রুমের বাসা ভাড়া নিতে হলেও ৮ হাজার টাকা লাগে। এর সঙ্গে খাদ্য, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল, ওষুধ, সন্তানের পড়ালেখা-সব মিলে শ্রমিকের জীবনমান বজায় রাখতেই ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘ঠিকমতো খেতে না পারলে শ্রমিকের উৎপাদনকাজ বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালেয় শ্রম অনুবিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরিকাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি পাঁচ বছর পরপর ছিল। ২০২৬ সালে যখন শ্রম আইন হয় তখন এটি সংশোধন করা হয়। শ্রম আইন সংসদে পাস হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিলে। কিন্তু শ্রম বিধিমালা এখনো হয়নি। এর কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। আর এটি শেষ হলেই শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।’

নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ বলেন, ‘পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে এখন পর্যন্ত মজুরি বোর্ড গঠন হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে মজুরি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্্ন শ্রমিক সংগঠন থেকে আবেদন পেয়েছি। এগুলো একত্র করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এখনো নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর শেষ হয়নি। এ ক্ষেত্রে বোর্ড গঠন হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের বোর্ড গঠন করে দেওয়ার পরই মজুরি নির্ধারণ করা হবে।’

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘শ্রমিক প্রতিনিধিরা যেভাবে বৈঠক করেছেন, আমরাও সংগঠনের সদস্য ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আলোচনা করব। সার্বিক পর্যালোচনা শেষে সবার মতামতের ভিত্তিতেই বিজিএমইএর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান স্পষ্ট করা হবে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নিয়ম মেনে আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে। তবে সেই আন্দোলন যেন কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির দিকে না যায় সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।’

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘মজুরি বা বেতন বৃদ্ধি উপযুক্ত সময়ে সরকার করতেই পারে। তবে তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের যে আইন সংসদে পাস হয়েছে, তা আইন জারির সময় থেকেই গণনা করতে হবে। আইন কখনো তা পাসের আগের সময় থেকে কার্যকর হয় না। চলতি বছরের এপ্রিলে আইন পাস হয়ে থাকলে ২০২৯ সালের এপ্রিলের আগে তিন বছর পূর্ণ হয় না। আর যদি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত মজুরি বোর্ডকে ভিত্তি ধরা হয়, তবে আগের পাঁচ বছরের আইন অনুযায়ী ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের আগে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’

ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমাদের একটি টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। অন্য সব শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কত হবে তার পক্ষে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য দাবি তুলে ধরতে চাচ্ছি। এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতির সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি ও শ্রমিকদের প্রত্যাশার কথা আমরা তাঁদের জানিয়েছি।’ আইবিসি সভাপতি বলেন, ‘৪ অক্টোবর মজুরি নির্ধারণে শ্রমমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হবে এবং ওই সময়ের মধ্যেই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হবে।’